কমছে বিশ্বের সঞ্চিত পানি, বিপদ কি ঘনাচ্ছে?

বিশ্বব্যাপী নদীগুলোর অবস্থা নিয়ে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সম্প্রতি একটি বিস্তৃত গবেষণার ভিত্তিতে এক আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালটি বিশ্বব্যাপী নদীগুলোর জন্য তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে অন্যতম শুষ্কতম বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছে। বিশ্বের সামগ্রিক পানি সঞ্চয়ের যে ভাণ্ডার রয়েছে, তা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-পৃষ্ঠের সঞ্চিত পানি, যার মধ্যে রয়েছে পাতাল জল, হ্রদ, নদী, বরফ, মাটির আর্দ্রতা এবং উদ্ভিদ ও গাছের মধ্যকার পানি, তা গত বছর স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে প্রায় ৪২ শতাংশ নিচে নেমে গেছে।

জলবায়ু সংকটের প্রভাবে চরম আবহাওয়া এবং আবহাওয়ার আকস্মিক চরম রূপান্তরের ঘটনাগুলো বাড়ছে। যা বিশ্বের পানি চক্রকে আরও অনিশ্চিত ও অসংলগ্ন করে তুলছে। গলতে থাকা হিমবাহ থেকে শুরু করে তীব্র খরা এবং আকস্মিক বন্যা; সবমিলিয়ে পৃথিবীর নদীগুলো কখনও অতিরিক্ত পানি আবার কখনও তীব্র পানিশূন্যতার দুই চরম সীমার মধ্যে দোল খাচ্ছে।

ডব্লিউএমও-র এই গবেষণায় ১৩টি বৈশ্বিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলের সিমুলেশন এবং প্রত্যক্ষ আবহাওয়া সংক্রান্ত উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, গত সাত বছরে বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক প্রবাহ থাকা নদীর সংখ্যা ১৯৯১ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণতার বছর ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নদী স্বাভাবিক সীমার মধ্যে প্রবাহিত হলেও ৩৬ শতাংশ নদীর অববাহিকায় পানির প্রবাহ ছিল স্বাভাবিক বা তুলনামূলক অনেক কম। অন্যদিকে প্রায় ২১ শতাংশ নদীর প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা অনেক বেশি ছিল।

সংস্থাটির মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো একে সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে মানুষ কার্যত পৃথিবীর পানির সঞ্চিত আমানত খরচ করে ফেলছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে বিশ্বব্যাপী ভূ-পৃষ্ঠের পানি সঞ্চয় ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পর থেকেই একটি অব্যাহত নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে, যা বিগত এক দশক ধরে চলা একটি স্থায়ী সংকেত।

শুধু নদীই নয়, হিমবাহের অবস্থাও একইভাবে উদ্বেগজনক। গবেষণায় দেখা যায়, টানা চতুর্থ বছরের মতো বিশ্বের ১৯টি প্রধান হিমবাহ অঞ্চলের প্রতিটিতে বরফের ভর হ্রাস পেয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে হিমবাহগুলো সবচেয়ে বেশি বরফ হারিয়েছে এবং এই ক্ষতির গতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি রূপ নিয়েছে। কেবল ২০২৫ সালেই বরফের ভর কমার পরিমাণ ছিল ৪০০ গিগাটন, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাকে ১.১ মিলিমিটার বাড়িয়ে দিয়েছে।

ডব্লিউএমও-র হাইড্রোলজি বিভাগের পরিচালক ওয়েন জেনকিন্সন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই বৈশ্বিক বিশ্লেষণটি পানি সম্পদের ক্রমশ কমতে থাকা পরিস্থিতির বিপরীতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার একটি আহ্বান। পানির এই ঘাটতি মোকাবেলায় বৈশ্বিক স্তরে উপাত্ত সংগ্রহ ও তথ্য আদান-প্রদান দ্বিগুণ করা প্রয়োজন, যাতে মানুষের জীবন ও সুস্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হয়।

নদীগুলোর এই সংকট আজ কেবল পরিবেশগত সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত হানছে। যেমন, গত গ্রীষ্মে দানিউব নদীতে পানি রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ার ফলে হাঙ্গেরি এবং রোমানিয়ায় অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল। পানির মাত্রা অত্যন্ত কমে যাওয়ায় পারমাণবিক চুল্লি ঠাণ্ডা করার মতো পানি না থাকায় দেশ দুটির একটি ছাড়া সবকটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০টি পৌরসভার প্রধান পানির উৎস মিসিসিপি নদী বর্তমানে কেমিক্যাল দূষণের শিকার, যা মেক্সিকো উপসাগরে অক্সিজেনশূন্য মৃত অঞ্চল বা ‘হাইপক্সিক ডেড জোনের’ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জলাভূমি ধ্বংস করছে এবং নোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়াচ্ছে, যার সাথে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন খরা। আফ্রিকার প্রধান নদীগুলোর মধ্যে নীল নদ, নাইজার এবং জাম্বেজি নদী চরম দূষণ ও জলবায়ুজনিত খরার মুখে পড়ে তাদের নদীর স্বাভাবিক পানির স্তর হারিয়ে ফেলছে এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখে পড়ছে।

এমনকি ইংল্যান্ডেও কোনো নদীই এখন সম্পূর্ণ ভালো রাসায়নিক বা পরিবেশগত অবস্থায় নেই। পয়োবর্জ্য ও কৃষিভিত্তিক দূষণ, ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান এবং মাত্রাতিরিক্ত পানি উত্তোলনের এক বিষাক্ত মিশ্রণে নদীগুলো এখন মারাত্মকভাবে জর্জরিত।

ডব্লিউএমও-র প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে নদীগুলোর ওপর অব্যাহত এই হুমকি আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। ২০২৫ সালে পরপর সপ্তম বছরের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকা নদীর অববাহিকার সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম; যা মোট নদীর মাত্র ৩৪ থেকে ৩৮ শতাংশ। অথচ ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের দিকে তাকালে দেখা যায় যে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই হার ছিল ৪৬ শতাংশ।

২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার পাঁচ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাজন ও লা প্লাটা অববাহিকার বড় অংশ, উত্তর আমেরিকা, মধ্য ও পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের নদীগুলোতে বারবার স্বাভাবিকের চেয়ে কম পানির প্রবাহ দেখা গেছে। নদীগুলোর তলানিতে পানি থাকার এই চিত্রটি উত্তর আমেরিকার বড় অংশ, দক্ষিণ আমেরিকার লা প্লাটা ও সাও ফ্রান্সিসকো অববাহিকা, পূর্ব ইউরোপীয় অববাহিকা, মধ্য প্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়া জুড়েই প্রকট ছিল।

বিগত পাঁচ বছরের প্রতিটিতেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতীয় আবহাওয়া ও হাইড্রোলজিক্যাল সংস্থাগুলো রেকর্ড ভাঙা বন্যা এবং মারাত্মক খরার রিপোর্ট দিয়েছে। অনেক অঞ্চলে একের পর এক বিপর্যয় ঘটেছে যে পরিবেশ বা মানুষ এই চরম আবহাওয়ার ধাক্কা সামলে ওঠার মতো ন্যূনতম কোনো সময় পায়নি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান