এইচআইভি সংক্রমণের উদ্বেগজনক বৃদ্ধির কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ফিজিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে নতুন সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতিসংঘের এইডসবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফিজিতে প্রায় ৯ হাজার ১০০ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ নিজেদের সংক্রমণের বিষয়ে জানতেন এবং অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসার আওতায় ছিলেন মাত্র ২২ শতাংশ।
ফিজির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের জাতীয় পরিসংখ্যান বলছে, ওই বছর দেশটিতে নতুন করে ২ হাজার ১৬ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর আগের বছর ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৮৩। ফলে এক বছরের ব্যবধানে নতুন শনাক্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর কারণেও আগে শনাক্ত না হওয়া অনেক রোগী এবার শনাক্ত হয়েছেন।
ইউএনএইডসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ফিজিতে প্রায় প্রতি ৬০ জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। পাঁচ বছর আগেও এই অনুপাত ছিল প্রতি ১৬৭ জন প্রাপ্তবয়স্কে প্রায় একজন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ফিজিতে নতুন এইচআইভি সংক্রমণ প্রায় ১২ গুণ বেড়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংক্রমণের প্রকৃতি ও বিস্তার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে দেশজুড়ে পরীক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। ফলে শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে সংক্রমণ বাড়ার পাশাপাশি উন্নত শনাক্তকরণ ব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। তারপরও ২০২৫ সালে নতুন শনাক্তের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এইচআইভি ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউএনএইডসের তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের মাধ্যম যেসব ক্ষেত্রে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি যৌন সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ৪২ শতাংশের বেশি সংক্রমণ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিশেষ করে ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগি করার ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তবে পরিস্থিতি শুধু মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মা থেকে শিশুর মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণও ফিজির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে ৫৯টি শিশু এইচআইভি নিয়ে জন্ম নেয়। তাদের মধ্যে ১৮ জন প্রথম জন্মদিনের আগেই মারা যায়। একই সময়ে গর্ভবতী নারীদের মধ্যেও এইচআইভি সংক্রমণের হার বেড়েছে।
ফিজির স্বাস্থ্যমন্ত্রী আন্তোনিও লালাবালাভু বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে আর সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার বিনা মূল্যে স্বেচ্ছামূলক ও গোপনীয় এইচআইভি পরীক্ষা আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করছে। সংক্রমণ প্রতিরোধেও বিভিন্ন কর্মসূচি বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রি-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা প্রিইপি—সংক্রমণের আগে প্রতিরোধমূলক ওষুধ—ব্যবহারের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের জন্য সুচ ও সিরিঞ্জ সরবরাহ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও করেছে সরকার। ব্যবহৃত সুচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগি কমিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করাই এর লক্ষ্য। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ওষুধের ব্যবস্থাও আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংকট মোকাবিলায় পাঁচজন মন্ত্রীর সমন্বয়ে একটি মন্ত্রিসভা উপকমিটিও গঠন করেছে ফিজি সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সরকারের অন্যান্য বিভাগকে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন বাধা দূর করার চেষ্টা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউএনএইডস ফিজির এই উদ্যোগে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে।
এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করা ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ। ইউএনএইডস ও ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, সাধারণ দৈনন্দিন সংস্পর্শের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। নিয়মিত ও কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে ভাইরাসের মাত্রা অনির্ণেয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হলে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। তাই ভয় ও ভুল ধারণার বদলে পরীক্ষা, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফিজির জনসংখ্যা ১০ লাখেরও কম। এত কম জনসংখ্যার দেশে এইচআইভি সংক্রমণের দ্রুত বিস্তার দেশটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ইউএনএইডসের মতে, ফিজির পরিস্থিতি পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত হওয়ায় নতুন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেও ফিজি সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় আতঙ্কের পরিবর্তে সমন্বিত স্বাস্থ্য উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণ, মাদক ব্যবহারজনিত সংক্রমণ কমানো, মা ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং এইচআইভি আক্রান্তদের প্রতি বৈষম্য কমানোর মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফিজির বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা নয়—প্রতিরোধ, সচেতনতা এবং সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট





