ষড়যন্ত্রে পা দেব না, ঐক্যবদ্ধ আছি: মামুনুল হক

১১ দলের ঐক্য নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেন না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্র মেরামত, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্ধারণ, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা ও ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করার লড়াইয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ আছেন। এই ঐক্যের পরিসর আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন মামুনুল হক।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের রাষ্ট্র মেরামত করার এবং হাজার হাজার শহীদের রক্তের যে দায়, সেই দায় নিয়ে মাঠে নেমেছি। কাজেই আমরা কোনো ষড়যন্ত্র, কোনো চক্রান্তের ফাঁদে পা দেব না।’

মামুনুল হক বলেন, এই ঐক্যকে শুধু বিরোধী দলের ঐক্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্র এবং আগামী দিনের রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্ধারণের লড়াইয়ে তারা একসঙ্গে রয়েছেন। দেশের গতিপথ নির্ধারণ, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করার এই লড়াইয়ে তাদের ঐক্য অব্যাহত থাকবে। ধীরে ধীরে এই ঐক্যের পরিসর আরও বাড়বে, কমবে না।

১১ দলের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় কার্যকর করা এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সংকট সমাধানের দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করছেন তারা। এর ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের রংপুর অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এবার তৃতীয় কর্মসূচি হিসেবে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।

মামুনুল হক জানান, ওই দিন সকাল ৭টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করে লংমার্চ কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে।

লংমার্চে দেশের জনগণকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ১৮ কোটি মানুষের প্রাণের দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। অতীতের দুটি লংমার্চের মতো এবারও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি সফল হবে বলে তারা আশা করছেন।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কারের দাবি এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন সংকট সামনে রেখে এই লংমার্চের আয়োজন করা হচ্ছে। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বিচার বিভাগের দলীয়করণ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিও এতে তুলে ধরা হবে।

বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, শরিফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডসহ জুলাই গণহত্যা ও শাপলা গণহত্যার বিচার এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এসব দাবির পাশাপাশি নাগরিক জীবনের সংকট সমাধানে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

লংমার্চ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চান তিনি। বলেন, কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টি বা দূরভিসন্ধিমূলক তৎপরতা চালানো হবে না বলে তারা আশা করছেন। তবে এ ধরনের কোনো অপতৎপরতা দেখা গেলে তা প্রতিহত করেই কর্মসূচি সফল করা হবে।

সংবাদমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কর্মসূচিতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, জনদাবি আদায়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন বলে তারা প্রত্যাশা করেন।

দেশের চলমান সংকটগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দল হিসেবে তারা সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ পর্যন্ত সহনশীল কর্মসূচিও পালন করেছেন তারা।

তবে বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণে সরকার আগ্রহী নয় বলে মনে হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘জনগণের অধিকার আদায়ে আমরা প্রয়োজনে আরও কঠোর হব।’

সরকারের উদ্দেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির বলেন, জনগণের ক্ষমতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে জনগণের মনোভাব, ইচ্ছা ও অভিপ্রায় অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে। অন্যথায় পরিণাম ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মামুনুল হক বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কি না, সে বিষয়ে তারা আস্থা রাখতে পারছেন না। নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে সরকার নিরপেক্ষতার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা রয়েছে বলে জানান তিনি। মামুনুল হকের ভাষ্য, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তারা চুপ করে বসে থাকবেন না।

জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে মামুনুল হক বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাদের উদ্বেগের নিরসন না হলে কমিশনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কর্মসূচি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তাও দেন তিনি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ১১ দলের বৈঠকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে পরবর্তী প্রশ্নের জবাবে জানান তিনি। এ বিষয়ে এর আগে দলগুলোর পক্ষ থেকে যে অবস্থান জানানো হয়েছিল, তা-ই বহাল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মামুনুল হক।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির। বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে বিচারবহির্ভূত ক্রসফায়ারের মতো বিষয়ে বক্তব্য আসা অত্যন্ত আতঙ্কজনক। এ ধরনের বক্তব্যে তারা স্তম্ভিত এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফরের সফরসঙ্গী নির্বাচন ও আয়োজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, সফরসঙ্গী হিসেবে এমন ব্যক্তিদের নেওয়া হয়েছে, যারা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করার উপযুক্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘোরাফেরা ও বিনোদনের সফরে পরিণত করার মতো আয়োজন দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এসব বিষয় দেশের মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও সংশয় তৈরি করছে। সরকার বিষয়গুলো নিয়ে আরও চিন্তাভাবনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সংসদের চতুর্থ অধিবেশন সামনে রেখে বিরোধী দলের উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন মামুনুল হক। বলেন, আসন্ন অধিবেশনে সরকারের এজেন্ডাগুলো কতটা জনবান্ধব হবে এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে তারা সন্দিহান।

এ বিষয়ে সংসদ অধিবেশনের আগে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আবারও বৈঠক করা হবে। সেখানে আলোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকা থেকে খুলনা ও কুষ্টিয়াগামী লংমার্চের পথে গোপালগঞ্জ থাকায় সেখানে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে এ ধরনের আশঙ্কা নেই বলে তারা মনে করেন।

মামুনুল হক বলেন, গোপালগঞ্জে ইসলামপন্থি ও দেশপ্রেমিক বিপুল জনগোষ্ঠী রয়েছেন। লংমার্চের সময় তারা ব্যাপকভাবে রাজপথে থাকবেন বলে আশা করছেন। কোনো দূরভিসন্ধিমূলক অপতৎপরতা বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের চেষ্টা হলে তা রাজপথেই মোকাবিলা করা হবে।

গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে এর দায় সরকার ও প্রশাসনকে বহন করতে হবে।

খুলনায় লংমার্চের সমাবেশস্থল হিসেবে জেলা স্কুল নির্ধারণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মামুনুল হক বলেন, জেলা স্কুলের জায়গা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সেখানে জায়গা ছোট এবং প্রবেশপথগুলো সংকীর্ণ হওয়ায় কিছু সমস্যা রয়েছে।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সমাবেশস্থল চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমে জেলা স্কুলে কর্মসূচি পালনের কথা বলা হলেও এখন তারাও বিষয়টি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।

১১ দলের ঐক্য ও কর্মসূচির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে মামুনুল হক বলেন, সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র মেরামতের দাবিতে তারা মাঠে নেমেছেন। কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবেন না তারা।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আবারো বলেন, এই ঐক্য কেবল বিরোধী দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের রূপরেখা নির্ধারণ এবং দেশের গতিপথ ঠিক করার বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই তারা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।

এ সময় ভারতের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে রাজনৈতিকভাবে যারা এ ধরনের অভিযোগ করছেন, বৈঠক মনেহয় তাদের সঙ্গেই হয়েছে। তারা বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা ও মহাসচিবরা উপস্থিত ছিলেন।