ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু একটি ট্রফির লড়াই নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লেখা গৌরব, কান্না, বিস্ময় আর অমরত্বের গল্প। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরু করা এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত বহু দেশ বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু খুব অল্প কয়েকটি দলই সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছে।
এবার যেমনটা পারলো স্পেন। নিউজার্সি স্টেডিয়ামে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে সাফল্যের সপ্তম স্বর্গে পা রাখল ইউরোপের এই দেশটি।
১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক উরুগুয়ে নিজেদের মাঠেই প্রথম চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় লেখে। এরপর ১৯৩৪ ও ১৯৩৮-দুই আসরেই আধিপত্য দেখায় ইতালি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত না হলেও, ১৯৫০ সালে ফিরে এসে উরুগুয়ে ব্রাজিলকে হারিয়ে ‘মারাকানাজো’র জন্ম দেয়!
১৯৫৪ সালে পশ্চিম জার্মানির ‘মিরাকল অব বার্ন’, ১৯৫৮ সালে ১৭ বছরের এক কিশোর পেলের হাত ধরে ব্রাজিলের প্রথম শিরোপা, ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের শিরোপা ধরে রাখা এবং ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ-প্রতিটি আসরই ফুটবলের ইতিহাসে আলাদা অধ্যায় হয়ে আছে। ১৯৭০ সালে পেলের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ে ব্রাজিল বিশ্ব ফুটবলের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৭৪ সালে স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানি, ১৯৭৮ সালে মারিও কেম্পেসের আর্জেন্টিনা, ১৯৮২ সালে পাওলো রোসির ইতালি এবং ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতে। এরপর ১৯৯০ সালে আবারও জার্মানি, ১৯৯৪ সালে পেনাল্টিতে ইতালিকে হারিয়ে ব্রাজিল, ১৯৯৮ সালে জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে ফ্রান্স এবং ২০০২ সালে রোনালদোর দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে ব্রাজিল রেকর্ড পঞ্চম শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ে।
২০০৬ সালে ইতালি চতুর্থবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১০ সালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সময়ের গোলে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। ২০১৪ সালে মারিও গোটজের গোলে জার্মানি চতুর্থ শিরোপা জিতে, ২০১৮ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পের উত্থানে ফ্রান্স দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হয়। আর ২০২২ সালে লিওনেল মেসির স্বপ্নপূরণে আর্জেন্টিনা ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত উপহার দেয়।
২০২৬ সালে সেই গল্পে নতুনত্ব যোগ করার সুযোগ থাকলেও পায়নি আর্জেন্টিনা। স্পেনের কাছে ০-১ গোলে হেরেছে কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা। দুর্দান্ত ফুটবল খেলে শেষ হাসি লামিন ইয়ামালের স্পেনের!
একসময় ব্রাজিল ছিল বিশ্বকাপের একচ্ছত্র প্রতীক। পরে জার্মানি ও ইতালি নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। ম্যারাডোনা থেকে মেসি-আর্জেন্টিনা বারবার প্রমাণ করেছে, প্রতিভা আর আবেগ একসঙ্গে থাকলে বিশ্বজয় সম্ভব। স্পেন দেখিয়েছে তিকি-তাকার সৌন্দর্য, ফ্রান্স দেখিয়েছে নতুন প্রজন্মের শক্তি, আর উরুগুয়ে ও ইংল্যান্ড স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিহাস কখনো পুরোনো হয় না!





