রেল নিরাপত্তায় নতুন যুগে ভারত, দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে ‘কবচ’ প্রযুক্তি

ভারতীয় রেলওয়ের স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা ‘কবচ ৪.০’-এর সম্প্রসারণ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশটির দুই হাজার ৫৬৯ কিলোমিটার রুটে এই আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু হয়েছে। একই সঙ্গে আরও ২১ হাজার ৮৫৮ কিলোমিটার রুটে এর অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে।

ভারতের রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব লোকসভায় সংসদ সদস্য ডি. রবি কুমারের প্রশ্নের লিখিত জবাবে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, রিসার্চ ডিজাইনস অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অরগানাইজেশন ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ‘কবচ ৪.০’-এর অনুমোদন দেয়। নতুন সংস্করণটি আগের তুলনায় ট্রেনের অবস্থান আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।

তবে পরিসংখ্যান বলছে, যেখানে ‘কবচ’ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে, তার মাত্র প্রায় ১২ শতাংশ রুটেই এখন পর্যন্ত সর্বশেষ সংস্করণটি চালু করা সম্ভব হয়েছে।

দিল্লি-মুম্বাই ও দিল্লি-হাওড়া করিডরে অগ্রাধিকার
২০২৬ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত চালু হওয়া ২,৫৬৯ কিলোমিটার রুটের মধ্যে-

  • ১,৪২৩ কিলোমিটার রয়েছে দিল্লি-মুম্বাই করিডরে।
  • ১,১৪৬ কিলোমিটার রয়েছে দিল্লি-হাওড়া করিডরে।
    দিল্লি-মুম্বাই রুটে তিলক ব্রিজ, পালওয়াল, মথুরা, কোটা, নাগদা, রতলাম, ভাদোদরা ও বিরারের মধ্যবর্তী ১,৩২৭ কিলোমিটার অংশে ‘কবচ’ চালু হয়েছে। এছাড়া ভাদোদরা থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত আরও ৯৬ কিলোমিটার রুট এতে যুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে দিল্লি-হাওড়া করিডরে চিপিয়ানা থেকে সুবেদারগঞ্জ, কানপুর-লখনউ, ডিডিইউ-ভাবুয়া রোড, সাসারাম-ফেসার, গয়া-সরমাতার্ন-নিমিয়াঘাট এবং ছোটা আম্বানা-বর্ধমান-হাওড়া অংশে ধাপে ধাপে এই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে।

আরও ২১ হাজার কিলোমিটারে চলছে কাজ
ভারতীয় রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল, গোল্ডেন ডায়াগোনাল, হাই ডেনসিটি নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রুট মিলিয়ে মোট ২১ হাজার ৮৫৮ কিলোমিটার লাইনে ‘কবচ’ স্থাপনের কাজ চলছে।

দক্ষিণ রেলওয়ের গুদুর–চেন্নাই সেন্ট্রাল–আরাক্কোনাম–রেনিগুন্তা, আরাক্কোনাম–জোলারপেট্টাই এবং শোরানুর–এরনাকুলাম রুটেও কাজ এগিয়ে চলছে।

ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ
‘কবচ’ বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে-

  • ১১,২৫৩ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার কেবল বসানো হয়েছে।
  • ১,৬৬৮টি টেলিকম টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে।
  • ৯৮৮টি স্টেশনে ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে।
  • ৭,৭২৬ কিলোমিটার রুটে ট্র্যাকসাইড যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে।
    এছাড়া ছয় হাজার ১৫৩টি লোকোমোটিভে ‘কবচ’ প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। আরও সাত হাজার ৩২৭টি লোকোমোটিভ এবং এক হাজার ২০০টি ইএমইউ/এমইএমইউ ট্রেনে এটি স্থাপনের কাজ চলছে।

৯৪ হাজারের বেশি কর্মীকে প্রশিক্ষণ
প্রযুক্তি স্থাপনের পাশাপাশি জনবল প্রশিক্ষণেও জোর দিয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে।
এ পর্যন্ত ৯৪ হাজারের বেশি প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও অপারেটরকে ‘কবচ’ প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৭ হাজার লোকো পাইলট ও সহকারী লোকো পাইলট রয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ ইনস্টিটিউট অব সিগন্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস।

ব্যয় ও নতুন বরাদ্দ
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ‘কবচ’ প্রকল্পে ভারতীয় রেলওয়ে ব্যয় করেছে ৩ হাজার ৮৭৪ কোটি রুপি।
এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আরও ২ হাজার ৬৬ কোটি রুপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতির ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে অর্থ ছাড় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির রেল মন্ত্রণালয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি কিলোমিটার ট্র্যাকসাইড অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৫০ লাখ রুপি এবং প্রতিটি লোকোমোটিভে ‘কবচ’ স্থাপনে প্রায় ৮০ লাখ রুপি ব্যয় হয়। নতুন বরাদ্দ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আরও দ্রুত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি নিরাপত্তা ব্যয়
ভারতীয় রেলওয়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই ‘কবচ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ভারতীয় রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নিরাপত্তা খাতে ব্যয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ৩৯ হাজার ২০০ কোটি রুপি থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ২০ হাজার ৩৮৯ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে।
এছাড়া-

  • ৬,৬৭১টি স্টেশনে ইলেকট্রনিক বা বৈদ্যুতিক ইন্টারলকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
  • একই সংখ্যক স্টেশনে সম্পূর্ণ ট্র্যাক সার্কিটিং সম্পন্ন হয়েছে।
  • ১০,৩৯৫টি লেভেল ক্রসিং গেটে ইন্টারলকিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে
রেল মন্ত্রণালয়ের দাবি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

  • রেল জোড়ার (ওয়েল্ড) ত্রুটি ৩,৬৯৯ থেকে কমে ২৭২টিতে নেমে এসেছে।
  • রেললাইন ভাঙার ঘটনা ২,৫৪৮ থেকে ২০৮টিতে কমেছে।
    দুই ক্ষেত্রেই ৯০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।
    এছাড়া-
  • ২০১৪-১৫ সালে ১৩৫টি গুরুতর ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলেও,
  • ২০২৫-২৬ সালে তা কমে ১৬টিতে নেমে এসেছে।
  • দুর্ঘটনা সূচক ০.১১ থেকে কমে ০.০১-এ নেমেছে।
  • ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র দুটি গুরুতর দুর্ঘটনার তথ্য জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

আরও যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে
নিরাপত্তা জোরদারে ভারতীয় রেলওয়ে আরও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-

  • আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিতে রেললাইন পরীক্ষা,
  • ট্র্যাক জ্যামিতি পর্যবেক্ষণ,
  • নিয়মিত ট্র্যাক পরিদর্শন,
  • ট্রেনের প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ,
  • পুরোনো আইসিএফ কোচের পরিবর্তে আধুনিক এলএইচবি কোচ চালু,
  • এবং ২০১৯ সালের জানুয়ারির মধ্যে ব্রডগেজ লাইনের সব অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং তুলে দেওয়া।

একই সঙ্গে এলএইচবি কোচ উৎপাদনও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০০৪-০৫ থেকে ২০১৩-১৪ সময়কালে যেখানে ২ হাজার ৩৩৭টি কোচ তৈরি হয়েছিল, সেখানে ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৫-২৬ সময়ে উৎপাদন বেড়ে ৪৯ হাজার ৩৬৬টিতে পৌঁছেছে।

যাত্রী নিরাপত্তায় নতুন ভরসা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লি-মুম্বাই ও দিল্লি–হাওড়ার মতো ব্যস্ত রুটে ‘কবচ’ প্রযুক্তি চালুর ফলে ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, সিগন্যাল অমান্য করে এগিয়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত গতির মতো ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। যদিও এখনও পরিকল্পিত নেটওয়ার্কের বড় অংশে এই প্রযুক্তি স্থাপন বাকি রয়েছে, তবুও ভারতীয় রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূত্র: নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস