রেকর্ড দামে চা বিক্রি, উৎপাদন ও আয়ে এনটিসির নতুন মাইলফলক

দেশের চা-শিল্পে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল টি কম্পানি লিমিটেড (এনটিসি)। সম্প্রতি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চা-নিলামে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত চা ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় দামে বিক্রি হয়েছে।

একই সঙ্গে চলতি মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় আয় ও উৎপাদন-উভয় ক্ষেত্রেই নতুন সাফল্যের মুখ দেখছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক চা-নিলামে এনটিসির অধীনস্থ ১২টি চা-বাগানের মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৬০ কেজি চা বিক্রি হয়। নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ২৮০ টাকা ৫৯ পয়সা, যা এনটিসির ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। সরকার নির্ধারিত ২৪৫ টাকার ভিত্তিমূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি দামে চা বিক্রি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মোট আয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার ৭২২ টাকা।

নিলামে অংশ নেওয়া বাগানগুলোর মধ্যে রয়েছে- হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া, চুনারুঘাটের চণ্ডীছড়া, পারকুল এবং মৌলভীবাজারের ও সিলেট জেলার পাত্রখোলা, কুর্মা, চম্পারাই, মদনমোহনপুর, লাক্কাতুরা, মাধবপুর প্রেমনগর ও বিজয়া চা-বাগান। এসব বাগানে উৎপাদিত উন্নত মানের অর্থোডক্স ও সিটিসি চায়ের বেশ কয়েকটি লট নিলামে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।

তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটন জানান, চায়ের গুণগত মান বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাগান পর্যায়ে নিবিড় তদারকি এবং ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি’ চয়ননীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করায় কাঁচা পাতার গুণগত মান বহুগুণ বেড়েছে।

ফলে উৎপাদিত চায়ের রং, ঘ্রাণ ও স্বাদে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যা নিলামের বাজারে প্রতি কেজির দর বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রেখেছে।

এনটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের চা-উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও আমরা সার্বিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কারখানায় মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলেই উৎপাদন ও বিক্রয়-উভয় ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিকূল আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি এবং সার্বিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের চা শিল্প এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত এনটিসির এই ঘুরে দাঁড়ানোর খবর পুরো চা খাতের জন্যই আশাব্যাঞ্জক বার্তা বহন করছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসান বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বাগান শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ আমাদের বাগানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও মান উন্নয়নের যে বিশেষ কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছি, তার সুফল এখন দৃশ্যমান। চলতি আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমের বাকি সময়গুলোতে আরো ভালো উৎপাদন ও ভালো বিক্রয়ের প্রত্যাশা করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নে এনটিসি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের চারা রোপণ, কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এনটিসিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরো লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।’