মক্কা চুক্তি আমেরিকার আধিপত্য বলয়ে বড় আঘাত?

পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের যে একক প্রাধান্য বজায় ছিল, এই ত্রিদেশীয় জোট গঠনকে তার পতনের সূচনা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

গত ৭ আগস্ট মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে মাক্কাহ আল-মুকাররমা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট বা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির মূল নীতি অনুযায়ী, যেকোনো এক সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ বাকি দুই রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছেন, এটি ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো যৌথ প্রতিরক্ষার একটি প্রযুক্তিগত কাঠামো তৈরি করেছে। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটিকে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের বিরুদ্ধে একধরনের সুন্নি ন্যাটোভিত্তিক সামরিক জোট মনে হলেও বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল ও সুদূরপ্রসারী।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি অভিযানের পরবর্তী পরিস্থিতিতে রিয়াদ তার দীর্ঘদিনের আমেরিকান সুরক্ষা বলয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছে। গত কয়েক মাসে ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সামরিক সক্ষমতা এবং বাব আল-মানদাব ও হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে প্রভাব বিস্তারের যে ক্ষমতা দেখা গেছে, তা রিয়াদকে বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে পাকিস্তান বা তুরস্ক; কোনো দেশেরই ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর কিংবা ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করার রাজনৈতিক বা কৌশলগত ইচ্ছা নেই।

তুর্কি প্রশাসনিক নীতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, দেশটির সঙ্গে ইরানের কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন ও স্থিতিশীল সীমান্ত রয়েছে। আঙ্কারার জন্য ইরানের অস্থিতিশীলতা মানেই নতুন শরণার্থী সংকট, কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক পথের চরম ক্ষতি। অন্যদিকে পাকিস্তানেরও ভূ-রাজনৈতিক মূল মনোযোগ ভারতের দিকে নিবদ্ধ, পাশাপাশি দেশটির নিজস্ব বালুচিস্তান সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে ইরানের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই চুক্তিকে শুধুমাত্র ইরান-বিরোধী একটি সামরিক জোট হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলে তার অন্তর্নিহিত কৌশল বিঘ্নিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে, এই জোটটি একক কোনো শক্তির ওপর নির্ভর না করে একটি স্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ। সৌদি আরবের আর্থিক মূলধন ও কৌশলগত অবস্থান, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও বৃহৎ সামরিক বাহিনী এবং তুরস্কের সর্বাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় এই জোটকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। চুক্তিটি একটি মন্ত্রিপরিষদ কমিটি, সামরিক পরিচালনা কমিটি এবং সৌদি আরবে অবস্থিত একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কাঠামোগত রূপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এতে মিশর বা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির অন্তর্ভুক্তির পথও খোলা রাখা হয়েছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে বহুকেন্দ্রিক ক্ষমতার উত্থানের এই সময়ে এই তিন পরাশক্তির জোট নিশ্চিতভাবেই মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্যের একক ছায়াতলে ফাটল ধরিয়েছে। তবে এই বিশাল সামরিক ও অর্থনৈতিক জোটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে চলেছে ফিলিস্তিন ও গাজা সংকট। দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক অসংহতির সুযোগ নিয়ে বহিঃশক্তিগুলো যে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করেছে, তা নিরসনে এই নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।

মিডলইস্ট আই