দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ পরিক্রমা পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সফলভাবে পার করেছে তাদের গৌরবের ৪৮ বছর। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং নানা প্রতিকূলতা, দমন-পীড়ন ও রাজপথের কঠোর লড়াইয়ের পর দলটি আজ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। প্রতিষ্ঠার অর্ধশতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে রাজনৈতিক পালাবদলের এই নতুন প্রেক্ষাপটে বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবেই নয়, বরং দেশের নীতিনির্ধারণী ও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে নতুন রূপরেখা নিয়ে ভাবছে। অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে দলটি এখন দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়েছে।
সরকার গঠনের পর প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, কী ভাবছে বিএনপি : রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের পর এটিই বিএনপির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, যা দলটির ভেতরে ও বাইরে এক ভিন্ন আমেজ তৈরি করেছে। অতীতে যখনই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এসেছে, তখন দলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ হামলা, মামলা, কারাবাস ও পুলিশি হয়রানির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। রাজপথের সেই চিরচেনা স্লোগান আর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়ার চেনা দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় দলটির নীতিনির্ধারকেরা আত্মতুষ্টিতে না ভুগে বরং নতুন দায়িত্বশীলতার কথা বলছেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী-পরবর্তী মূল্যায়ন বৈঠকে দলের নীতিনির্ধারকেরা একমত হয়েছেন, ক্ষমতার মঞ্চে বসা মানেই সব অর্জিত হয়ে যাওয়া নয়; বরং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমে দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আদর্শকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এটাই মোক্ষম সময়। বিগত দিনের বঞ্চনা ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ক্ষত মুছে ফেলে একটি জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা উপহার দেওয়াই এখন দলটির প্রধান ভাবনা। দলীয় নেতাকর্মীদের সংযত থাকার এবং জনগণের অধিকার সমুন্নত রাখার কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে শীর্ষ পর্যায় থেকে।
ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ : বিগত গণঅভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে বিএনপি এখন এক বিশাল দায়িত্বের মুখোমুখি। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল এই নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে দলটি নিজেদের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে দেখছে। ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার উচ্চারণ করছেন, প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়; বরং সমঝোতা, সাম্য এবং মেধার ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনই তাদের মূল লক্ষ্য।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই শপথে দলটির পরিকল্পনা কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি অঙ্গনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ঢেলে সাজানো। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়ে দলটি বদ্ধপরিকর। তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও এখন বিএনপির নীতিনির্ধারণী টেবিলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাজপথ থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা : প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বারবার নানা ভাঙাগড়া ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে হয়েছে বিএনপিকে। রাজপথের সেই চিরচেনা আন্দোলন-সংগ্রামের দল থেকে আজকের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসীন হওয়া এক বিরাট রূপান্তর। এই রূপান্তর সামনে রেখেই বিএনপি তাদের রাজনৈতিক দর্শনে এনেছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
সংগ্রামের দিনের সেই জ্বালাময়ী কর্মসূচি আর ক্ষোভের রাজনীতির জায়গা এখন দখল করেছে নীতিনির্ভর সুশাসন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতি। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা জনগণের আস্থা অর্জন করেছি। রাজপথের সেই সংগ্রামী চেতনাকে এখন রূপান্তর করতে হবে সুশাসনের মাধ্যমে। রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের কোনো ভুল করার সুযোগ নেই। জনগণের প্রতিটি পাই পাই হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, আমরা আইনের শাসন ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করছি।’
সংগঠনকে আরও বেশি গতিশীল ও আধুনিক করার লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত সংস্কারের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজপথের পরীক্ষিত ও ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করার পাশাপাশি পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের মেধাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করার এক নতুন পথ ধরেছে দলটি।
এদিকে সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিএনপির অন্যতম সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা অতীতে যেভাবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়েছি, আজ নতুন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় এবং দলের সুশাসন বজায় রাখতে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করব। মাঠে থেকে জনকল্যাণমূলক কাজ বাস্তবায়নে আমাদের কর্মীরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’
এসব নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, গৌরবের ৪৮ বছর পেরিয়ে আসা বিএনপি বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি পেছনে ফেলে জনকল্যাণ, সুশাসন, সাম্য ও সমৃদ্ধির এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বিএনপি প্রমাণ করতে চায় যে, তারা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায়নি, বরং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
জনকল্যাণ ও সুশাসনের অঙ্গীকার নিয়ে নতুন ভাবনা : একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূল করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘জনগণ দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ভোটাধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বিএনপি ক্ষমতায় এসেই সেই বঞ্চনা দূর করার কাজ শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা এসেছি, তাই জনকল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের রাজনৈতিক টিকে থাকার একমাত্র শর্ত।’
পাশাপাশি দলটির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি সব সময় মাটি ও মানুষের জন্য। অতীতে আমাদের নেতাকর্মীরা অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন কেবল মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য। আজ যখন আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে, তখন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের প্রধান ব্রত। কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়মকে ছাড় দেওয়া হবে না, তা দলের ভেতরের কেউ হোক কিংবা বাইরের।’





