রাজধানীর গাবতলীতে বেপরোয়া গতিতে যাচ্ছিল হলুদ রঙের একটি স্পোর্টস কার। ট্রাফিক পুলিশ গাড়িটিকে থামার সংকেত দেয়। কিন্তু গাড়িটি না থামিয়ে গতি বাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশ ধাওয়া করে। হঠাৎ গাড়িটি থেমে যায়। গাড়ি থেকে এক যুবক নেমে পালানোর চেষ্টা করে।
সাজ্জাদ হোসেন আশিক নামে ওই যুবককে পুলিশ পাকড়াও করে। কিন্তু গাড়িতে থাকা অন্য যুবক গাড়ি নিয়ে চম্পট। গত ১৮ এপ্রিলের এ ঘটনায় পুলিশ আশিকের দেহ তল্লাশি করে বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন খুঁজে পায়।
অস্ত্রের মূল মালিক শাহরিয়ার চৌধুরী গাড়ি নিয়ে পালানোর পর সেদিনই দেশ ত্যাগ করেন। তবে তদন্তকারীরা চমকে ওঠেন- দাগি সন্ত্রাসী না হয়েও আশিকের কাছে পুলিশের ব্যবহৃত সেমি অটোমেটিক ৯ এমএম পিস্তল দেখে। অস্ত্রটিতে খোদাই করে মেইড ইন ব্রাজিল, বিপি-এমটিসিএল লেখা ছিল। যা পুলিশের এসআই থেকে ঊর্ধ্বতন অফিসাররা ব্যবহার করেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা অস্ত্রটি কোন থানা থেকে লুট করা হয়েছে সেটি নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ধানমন্ডিতে একটি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিল সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকার সুমন আজাদ চৌধুরীর ছেলে শাহরিয়ার।
৪ লাখ টাকায় সে অত্যাধুনিক অস্ত্রটি কিনেছিল এক সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছ থেকে। তবে সে গ্রেপ্তার না হওয়ায়- কোন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছ থেকে অস্ত্রটি কিনেছিল, সেটি নিশ্চিত হতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।
গত ২ মার্চ স্বামীবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমানকে গুলির ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া তিনটি পিস্তল ও রিভলবারের হোতা হিসেবে নাম আসে শীর্ষ মাদক কারবারি অটো সজলের। পরে পুলিশ অটো সজল ও তার ভাই সজীবসহ চক্রের আরও কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।
উদ্ধার হয় আরও ছয়টি অস্ত্র। সজল ও তার ভাইয়ের কর্তৃত্বে থাকা উদ্ধার হওয়া এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে ৪টি ওয়ারী থানা থেকে লুটের অস্ত্র। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, অটো সজল লুটের অস্ত্র অপরাধীদের কাছে উচ্চমূল্যে ভাড়া দিত।
শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়- গণ অভ্যুত্থানের সময় সুযোগ বুঝে বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে অস্ত্র লুট করে মজুত করে অপরাধী চক্র। শুরু থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল- এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঝুঁকি কমবে না। বাস্তবে হয়েছেও তাই। ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লুটের অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখা গেছে।
বিশেষ করে আধিপত্য বিস্তার, মাদক সাম্রাজ্য রক্ষা, টার্গেট কিলিং ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনায় ব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লুটের অস্ত্র ভাড়া অথবা বিক্রির মাধ্যমে রমরমা বাণিজ্য চলছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দারা। এক সময় ফেসবুকসহ বিভিন্ন স্যোসাল মিডিয়ায়ও বিভিন্ন অস্ত্রের ছবি দিয়ে প্রকাশ্যে বিক্রি করতে দেখা গেছে।
এদিকে গত রবিবার সন্ধ্যায় গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেক এলাকায় এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি গুলির খোসা। পুলিশের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই এলাকার মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে অটো সজল ও তার ভাই সজীব।
সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়ে তারা কারাগারে থাকায় মাদকের বাজারে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটাতে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানা থেকে লুটের অস্ত্র ব্যবহার হতে পারে বলে ধারণা পুলিশের। কেননা অটো সজল ছাড়াও তার প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর কাছে লুটের অস্ত্র মজুত রয়েছে বলে তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে।
উদ্ধার হয়নি লুটের ১৩১০টি অস্ত্র : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। ১ হাজার ৩১০টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে- ১০৯টি চায়না রাইফেল, একটি বিডি রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ চায়না পিস্তল, ৪৪৩টি ৯ এমএম পিস্তল, ৩৮৪টি ১২ বোর শটগান, ১২৮টি গ্যাস গান, ৭টি গ্যাস লাঞ্চার, দুইটি ২৬ মি.মি. সিগন্যাল পিস্তল। এ ছাড়াও ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০টি গুলি, ১১ হাজার ৩৯১টি টিয়ার গ্যাস সেল, ২৯১টি টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড, ১ হাজার ১৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৪১টি কালার স্মোক গ্রেনেড, ২২টি সেভেন/মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ২৮৪টি ফ্ল্যাাশ ব্যাং গ্রেনেড, ১১৬টি হ্যান্ড হেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে উদ্ধার হয়নি।
র্যাবের নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযান জোরদার : পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, লুটের অস্ত্র উদ্ধারে র্যাবের নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও অন্য সংস্থাগুলো সহযোগিতা করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অস্ত্র বাইরে আছে মানে কেনাবেচা ও অপব্যবহার হতেই পারে। বিভিন্ন তৎপরতাও আমরা দেখছি। সেই হিসেবে অস্ত্র উদ্ধারের সফলতা কিছুটা ধীরগতিতে এগিয়েছে। সমন্বিত অভিযানে সফলতা বাড়বে বলে আশা করছি।
উল্লেখ্য, গত শনিবার রাজধানীর রাজারবাগে পুলিশের ত্রিমাসিক অপরাধ সভার উদ্বোধন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য দিলে ১০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন





