রাতের ৩০০ ফুটে অপরাধের থাবা

দিনের আলোয় তাকালে মনে হয় উন্নত বিশ্বের কোনো দেশের আধুনিক জনপদ। প্রশস্ত সড়ক, দুপাশে খোলা আকাশ আর সবুজের হাতছানি। রাজধানীর কুড়িল থেকে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তৃত এই ‘৩০০ ফুট’ সড়কটি নগরবাসীর কাছে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা। কিন্তু সূর্য ডোবার পরপরই বদলে যায় এর রূপ। রাজপথের মায়াবী সোডিয়াম আলো ও অন্ধকারের মিশেলে এই সড়ক রূপ নেয় এক ভয়ংকর ‘ক্রাইম জোনে’। যেখানে আইনের চেয়ে বেপরোয়া গতি ও শৃঙ্খলার চেয়ে অপরাধীদের অট্টহাসিই বেশি প্রতিধ্বনিত হয়।

গত শনিবার রাত ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ৩০০ ফুট সড়ক, নীলা মার্কেট এবং বোয়ালিয়া ব্রিজ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উন্নয়নের পিচঢালা রাস্তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার জগতের বাস্তব চিত্র। ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে ৮টা ছুঁতেই সড়কে সাধারণ যানবাহনের সংখ্যা কমতে থাকে। তখনই ওই সড়ক দখল করে নেয় একদল উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণী। ১০ থেকে ২০টি স্পোর্টস বাইক যখন একসঙ্গে ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে, তখন মনে হয়, যেন কোনো রেসিং ট্র্যাক এই পথ। হেলমেটহীন এই তরুণদের তৎপরতা ও গগনবিদারী হর্নে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ চালকরা। রূপালী বাংলাদেশকে নীলা মার্কেটের ব্যবসায়ী আলী বলেন, রাত বাড়লেই প্রচণ্ড গতিতে বাইক চালানো শুরু হয়। তাদের ভয়ে আমরা রাস্তা পার হতেও সাহস পাই না। তারা পুলিশকেও পরোয়া করে না।

বোয়ালিয়া ব্রিজ এলাকায় নির্জন সড়কের পাশে সারি সারি দামি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী হচ্ছে। তবে একটু কাছে যেতেই নাকে আসে উৎকট গন্ধ। কোথাও গাঁজা ও ইয়াবার ধোঁয়া, কোথাও আবার দেশি-বিদেশি মদের গন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা এখানে গাড়ির ভেতরে বসে মাদক সেবন করে। প্রতিবাদ করলে উল্টো মামলা-হামলার হুমকি দেয় তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ সদস্য রূপালী বাংলাদেশকে জানান, মাদকাসক্ত এই তরুণদের সামলানো তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় এসব তরুণের রাজনৈতিক বা পারিবারিক পরিচয় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

রাত ১০টার পর নীলা মার্কেট ও সংলগ্ন এলাকায় ভিড় বাড়লে সক্রিয় হয়ে ওঠে বখাটে ও ছিনতাইকারী চক্র। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শুকরিয়া সাথী নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা জানিয়ে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখানে নিরাপত্তার অভাব প্রকট। একটু নির্জনে গেলেই বখাটেরা এসে অশালীন মন্তব্য করে। কোনো টহল পুলিশকে তাৎক্ষণিক খুঁজে পাওয়া যায় না।

ভোলানাথপুর এলাকার বাসিন্দা আজিজ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বাইকে করে এসে মোবাইল ও ব্যাগ ছিনতাই এখন ডালভাত হয়ে গেছে। চোখের পলকে ছিনতাই করে তারা গলি দিয়ে উধাও হয়ে যায়। সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, পূর্বাচল এলাকার নির্জন প্লটগুলো এখন খুনিদের নিরাপদ ডাম্পিং জোন। অন্য কোথাও খুনের পর ঠান্ডা মাথায় লাশ এনে ফেলে রাখা হয় এই এলাকায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে এই এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ আগস্ট পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কের আলমপুর ভূঁইয়া ব্রিজসংলগ্ন লেকে কাঠের গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় মেহেদী হাসান দিগন্ত (১৮) নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের দুই বন্ধু তুহিন (১৮) ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে (১৮) গ্রেপ্তার করা হয়। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে এসে মেহেদী এখানে খুন হন বলে জানা গেছে।

রূপগঞ্জ থানার ওসি এএইচএম সালাউদ্দিন জানান, পূর্বশত্রুতার জেরে মেহেদীকে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে নির্জন স্থানে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুমের উদ্দেশ্যে কাঠের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে লেকের পানিতে ফেলা হয়। তিনি বলেন, জনবসতি কম এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব থাকার সুযোগ নেয় অপরাধীরা। পূর্বাচলের বিশাল এলাকার অনেক সেক্টর এখনো বসতিহীন। স্ট্রিট লাইট থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

খিলক্ষেত থানার ওসি মোহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ৩০০ ফুট সড়কে আমরা নিয়মিত চেকপোস্ট বসাই। এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একটি এক্সপ্রেসওয়েতে রিকশা, বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন ছোট যানও চলাচল করে। যে কারণে এই সড়কে দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এ ছাড়া রাতে মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীদের তৎপরতাও লক্ষণীয়। আমরা সীমিত জনবল দিয়ে আমাদের অংশের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

পূর্বাচলকে নিরাপদ করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানান, পূর্বাচলে আইনশৃঙ্খলা জোরদারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় ৪টি থানা, ৬টি তদন্ত কেন্দ্র, ২টি পুলিশ লাইনস, ৩টি ডিসি অফিস এবং ৪১টি পুলিশ বক্স স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পূর্বাচলকে ডিএমপির আওতায় এনে একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের নেতৃত্বে পৃথক বিভাগ গঠন এবং প্রায় ৬ হাজার ৫২৪ জন জনবল সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, কেবল পুলিশি টহল দিয়ে পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের এই বিশৃঙ্খলা থামানো সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত নজরদারি; পুরো সড়কটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং স্পিড ক্যামেরা বসানো প্রয়োজন। এ ছাড়া অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন প্লটগুলোতে হাই-ভোল্টেজ লাইটের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া নিয়মিত মাদক ও গতিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ৩০০ ফুট সড়ক রাজধানীর উন্নয়নের এক গর্বিত ললাট। কিন্তু রাতের এই বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা সেই ললাটে কলঙ্কের তিলক এঁকে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, উন্নয়ন কি কেবল দৃশ্যমান অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তাও মিলবে? রাতের মায়াবী আলোয় মোড়ানো এই সড়কটি যেন আর কোনো লাশের শয্যা না হয়, সেই দাবিই এখন নগরবাসীর।