রাজধানী ঢাকার মানুষ বেঁচে থাকতে এক টুকরা মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে জীবনভর সংগ্রাম করে। মরে গেলে শেষবিদায়ের ঠিকানা কবরের মাটি পেতে ওই কষ্ট আরো ব্যয়বহুল, কঠিন-সীমাহীন।
এই শহরে বসবাসের জন্য যেমন অভিজাত এলাকা রয়েছে। তেমনি মারা যাওয়ার পর ‘শেষ ঠিকানা’র আভিজাত্যও কম নয়! রাজধানীর কোনো কোনো কবরস্থানের সাড়ে তিন হাত জায়গা পেতে সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। ভাত-কাপড়ের সংগ্রাম করতে করতে ক্লান্ত এই নগরবাসী কারো কারো মৃত্যুর পর শেষবিদায়ে মুক্তি মেলে চড়া মাশুলে।
তথ্য বলছে, রাজধানীর কোনো কোনো কবরস্থানে মাত্র ২০ বর্গফুটের মতো একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে কিংবা এক-দুই কোটি নয়, গুনতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। অথচ সাধারণ দাফনের সরকারি নিবন্ধন ফি মাত্র ৫০০ টাকা।
চারপাশে সুউচ্চ ভবন, করপোরেট অফিস, দামি ফ্ল্যাট, রেস্তোরাঁ ও আধুনিক নাগরিক সুবিধা। এই ব্যয়বহুল নগরজীবনের মাঝেই রয়েছে বনানী কবরস্থান। এখানে একটি কবরের জায়গা দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখার খরচ শুনলে অবাক হতে হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সারিতে দাফনের পর কোনো কবর ১৫ বছর সংরক্ষণ করতে চাইলে খরচ প্রায় তিন কোটি টাকা।
আর ২৫ বছরের জন্য দিতে হয় প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। অথচ কবরটির আয়তন প্রায় সাত ফুট দৈর্ঘ্য ও তিন ফুট প্রস্থ-২০ বর্গফুটের কিছু বেশি। অন্যদিকে সংরক্ষিত এলাকায় খালি জায়গা থাকা সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে কবর সংরক্ষণের নির্ধারিত ফি পরিশোধপূর্বক ১৫ ও ২৫ বছর মেয়াদি সংরক্ষণ করা যায়। এতে ১০ বছরের জন্য এক কোটি এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে।
হিসাব বলছে, জীবিত মানুষের বসবাসের জন্য যে অর্থে একটি বড় ফ্ল্যাট কেনা যায়, প্রায় সেই অর্থেই রাজধানীতে একজন মানুষের মৃত্যুর পর কয়েক হাত মাটির জায়গা দীর্ঘদিন ধরে রাখা হচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে, প্রায়ই একজন বয়স্ক ব্যক্তি কয়েক বছর ধরে নিজের জন্য কবরের জায়গা খুঁজছেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা খুব সাধারণ মৃত্যুর পর যেন নিজের জন্য একটি জায়গা থাকে। কিন্তু অর্থ থাকার পরও জায়গা মিলছে না। কারণ সংকট শুধু টাকার নয়, জমিরও। বনানী কবরস্থানে প্রতিদিন এমন অনেক মানুষ আসেন, যাঁরা প্রিয়জনের জন্য কিংবা নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কবরের জায়গা সম্পর্কে জানতে চান। কিন্তু জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেককেই ফিরতে হয়।
টাকা থাকলেও মিলছে না শেষ ঠিকানা : বনানী কবরস্থানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। এর মধ্যে পুরনো সংরক্ষিত কবরের পাশাপাশি সাধারণ কবরের জন্যও নির্দিষ্ট এলাকা রয়েছে। সাধারণ কবরের সরকারি নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। কবর খনন, বাঁশ, চাটাইসহ অন্যান্য নির্ধারিত খরচ আলাদা। সাধারণ কবরের মেয়াদ দুই বছর। এরপর জায়গাটি পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। তবে কোনো কবর সংরক্ষিত হলে সেখানে পরিবারের নির্দিষ্ট সদস্যদের পুনরায় দাফনের সুযোগ থাকে। সংরক্ষিত কবরে পুনর্দাফনের জন্য প্রতিবার দিতে হয় ৫০ হাজার ৫০০ টাকা।
বনানীতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ফি এত বেশি রাখার অন্যতম কারণ হিসেবে জায়গার সংকটের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ কবর যেন ব্যাপকভাবে দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করে ফেলা না হয় এবং নতুন দাফনের জায়গা আরো দ্রুত ফুরিয়ে না যায়, সে কারণেই সাধারণ কবরকে পরে দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করতে অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয়।
ঢাকার অন্য কবরস্থানেও একই বাস্তবতা : কবরের জায়গার এই সংকট শুধু বনানীতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানেরও প্রায় একই চিত্র। ডিএনসিসির সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতায় বর্তমানে সাতটি নিবন্ধিত পাবলিক কবরস্থান রয়েছে—বনানী, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন এবং উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টর ও চামুরখান কবরস্থান। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ৬৩.৫৪০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। ১৯৮৩ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত এখানে ৬৩ হাজার ৯১৭টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এখানে সাধারণ দাফনের সরকারি নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। বাঁশ, চাটাই ও কবর খননসহ নির্ধারিত খরচ যোগ হয় আরো এক হাজার ৪৫৬ টাকা।
গৌতম কুমার বিশ্বাস আরো জানান, দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের চিত্র ভিন্ন। ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা লাগে। সাধারণ এলাকার একটি কবর দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখতে চাইলে সেই ব্যয় তিন গুণ হয়ে ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। রায়েরবাজারেও ১৫ বছরের কবর সংরক্ষণে ১০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়।
এদিকে বনানী কবরস্থানের মোহরার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ২০০৭ সালের আগে বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করা কবরগুলোর মালিকানা সিটি করপোরেশনের হাতে নেই। এসব জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং দলিল করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এসব কবরে দাফনের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন শুধু পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।
দক্ষিণ ঢাকায়ও জমির সংকট : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় মুসলিমদের দাফনের জন্য তালিকাভুক্ত কবরস্থান রয়েছে পাঁচটি-আজিমপুর, জুরাইন, ধলপুর ব্রাহ্মণচিরণ, মুরাদপুর ও খিলগাঁও। এখানেও সাধারণ দাফনের নিবন্ধন ফি ৫০০ টাকা। কবর খনন, বাঁশ ও চাটাইসহ খরচ মিলিয়ে বড়দের দাফনে প্রায় এক হাজার ৫৮০ টাকা, মাঝারি কবরের ক্ষেত্রে এক হাজার ২১০ টাকা এবং শিশুর জন্য ৯৫৫ টাকা লাগে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে কবর সংরক্ষণ করতে গেলে দিতে হয় লাখ লাখ টাকা। আজিমপুরে ১০ বছরের জন্য কবর লিজের ফি পাঁচ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা। আজিমপুরে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি মরদেহ দাফন করা হয়। অথচ কবরস্থানের আয়তন বাড়ছে না। ফলে সাধারণ কবরের জায়গা দ্রুত পুনর্ব্যবহার করাই এখন বাস্তবতা।
এক কবরের ওপর আরেক কবর : কবরস্থানের জায়গা সীমিত হওয়ায় ঢাকার অনেক কবরস্থানেই নির্দিষ্ট সময় পর পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হয়। সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে দুই বছর বা নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলে পুরনো কবরের জায়গায় নতুন মরদেহ দাফন করা হয়। দক্ষিণ সিটির কিছু কবরস্থানে সাধারণ কবর প্রায় এক বছর পর্যন্ত রাখা হয়।
এই বাস্তবতা অনেক পরিবারের জন্য আবেগের। প্রিয়জনের কবরের পাশে দীর্ঘদিন বসে থাকা, ফুল দেওয়া কিংবা কবরটি আগলে রাখার যে মানসিক আকাঙ্ক্ষা—জায়গার সংকটের কারণে তা সব সময় সম্ভব হয় না।
তবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোতে সাধারণ এলাকায় দাফন করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১০ বছর বিনা মূল্যে কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। রায়েরবাজারে তাদের জন্য আজীবন সংরক্ষণের সুবিধার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত কবর ছাড়া অন্যান্য কবর সাধারণ কবর হিসেবে বিবেচিত হয়। মেয়াদি সংরক্ষিত কবরের মেয়াদ শেষ হলে স্বজনরা সেটি নবায়ন বা সময় বৃদ্ধি না করলে কবরটি সাধারণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সেখানে পরবর্তী সময়ে অন্য কাউকে দাফন করা যাবে।
দুই সিটি কবরস্থানে জমি কত? : দুই সিটি করপোরেশনের কবরস্থান ব্যবস্থাপনার চিত্র দেখলে সংকটের মাত্রা আরো স্পষ্ট হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর মোট জমি প্রায় ১৯২ একর। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর মোট জমি প্রায় ৫৯ একর। অর্থাৎ দাফনের চাহিদা বাড়লেও জমির পরিমাণ সেই হারে বাড়ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নতুন কবরস্থান তৈরির জন্য জমি নির্বাচনের কাজ করছে। তবে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নতুন জমি পাওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ।
জীবনের শেষে কয়েক হাত মাটিই তো চাওয়া : ঢাকা শহরে প্রতিদিন মানুষ আসছে। কেউ জীবিকার জন্য, কেউ স্বপ্নের জন্য, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য। শহর বাড়ছে, ভবন বাড়ছে, রাস্তা বাড়ছে। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা বাড়ছে না। একসময় কবর মানে ছিল কয়েক হাত মাটি। এখন সেই কয়েক হাত মাটিও হয়ে উঠেছে হিসাব-নিকাশের বিষয়।
কেউ ৫০০ টাকা দিয়ে প্রিয়জনকে দাফন করছেন। কেউ সেই কবরটি ১০, ১৫ কিংবা ২৫ বছর ধরে রাখতে লাখ লাখ টাকা দিচ্ছেন। আবার বনানীর মতো জায়গায় ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে গুনতে হচ্ছে সাড়ে চার কোটি টাকা। জীবনের পুরোটা সময় মানুষ যে শহরকে নিজের করে নিতে চায়, মৃত্যুর পর সেই শহরেই নিজের জন্য কয়েক হাত জায়গা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
কবরস্থান কি নগর পরিকল্পনার বাইরে? : নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, মানুষের জন্ম, জীবনযাপন ও মৃত্যুর প্রয়োজন—সবই একটি শহরের নাগরিক পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত। অথচ আবাসন, সড়ক, শিক্ষা, হাসপাতাল কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনার মতো কবরস্থানকে নগর পরিকল্পনায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ জানান, কবরস্থান মানুষের আবেগ ও সামাজিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘমেয়াদি কবর সংরক্ষণের জন্য এত বেশি অর্থ নির্ধারণ করাই ইঙ্গিত করে রাজধানীতে কবরস্থানের সংকট কতটা গভীর।
অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম মনে করেন, ঢাকার বেশির ভাগ মানুষ এখনো নিজ নিজ গ্রামের কবরস্থানে স্বজনদের দাফন করেন। তবে শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঢাকায় দাফনের প্রবণতা ভবিষ্যতে বাড়তে পারে।
তিনি জানান, বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালায় প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য এক একর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। সে হিসাবে ঢাকার জনসংখ্যা ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় কবরস্থানের প্রয়োজনীয় জমি কয়েক শ একর হতে পারে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায়ও (ড্যাপ) প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট কবরস্থান রাখার সুপারিশ রয়েছে।





