দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে 

পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিকল্পের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ায় দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

ধারাবাহিক শুল্ক-সুবিধা, কৌশলগত নীতিগত পদক্ষেপ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীরা এসব গাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছেন।

সবুজ রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, টেকসই গাড়িশিল্পের বিকাশ ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে সরকার পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে ও দূষণকারী জ্বালানিচালিত গাড়ির ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে শুল্ককাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক গাড়িতে প্রচলিত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন না থাকায়, এসব গাড়ির আমদানি শুল্ক নির্ধারণে প্রচলিত ইঞ্জিনের ঘনফল বা সিলিন্ডার ধারণক্ষমতার (সিসি) পরিবর্তে অন্যান্য প্রযোজ্য মানদণ্ডের পাশাপাশি শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বিবেচনা করা হয়।

বর্তমান করকাঠামোয় ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির মোট করভার (টিটিআই) ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে। ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করহার কমিয়ে ৮০ শতাংশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনবিশিষ্ট প্লাগ-ইন হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির (পিএইচইভি) করভার কমিয়ে ৭৩.৪৪ শতাংশ করা হয়েছে।

চার্জিং অবকাঠামো খাতেও উল্লেখযোগ্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী দ্রুত চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ও কর শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

এর বিপরীতে, ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনবিশিষ্ট প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির মোট করভার ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ করা হয়েছে।
এতে দেশীয় বাজারে ক্রেতাদের কাছে বৈদ্যুতিক গাড়ি তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা এবং দেশে পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানোর খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। প্রচলিত অকটেনচালিত গাড়ি চালাতে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১২ টাকা থেকে ১৫ টাকা খরচ হলেও বাসায় চার্জ দেওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এ খরচ মাত্র ১.৫০ থেকে ২.৫০ টাকা।

প্রচলিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়িতে চলমান যন্ত্রাংশও কম থাকে। এসব গাড়িতে জটিল অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন, প্রচলিত গিয়ারবক্স, রেডিয়েটর, পিস্টন কিংবা স্পার্ক প্লাগ থাকে না। ফলে প্রতি ৫ হাজার কিলোমিটার পরপর ইঞ্জিন অয়েল বা মবিল, এয়ার ফিল্টার ও অয়েল ফিল্টার পরিবর্তনের মতো নিয়মিত খরচ এড়ানো যায়। ব্রেক প্যাড ও টায়ারসহ কিছু যন্ত্রাংশের রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হলেও বৈদ্যুতিক গাড়ির নিয়মিত সার্ভিসিং ব্যয় সাধারণত অনেক কম।

ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিওয়াইডি, চাঙ্গান ডিপাল, এমজি, অডি ও বিএমডব্লিউর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অনুমোদিত পরিবেশকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করছে।

শোরুমের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচিত কয়েকটি মডেলের তালিকাভুক্ত দাম হলো— বিওয়াইডি সিল ৫ ডায়নামিক ৩৫ লাখ টাকা, বিওয়াইডি সিলায়ন ৫ এসেনশিয়াল ৪৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা, বিওয়াইডি সিল ৬ প্রিমিয়াম পিএইচইভি ৫২ লাখ টাকা, বিওয়াইডি অ্যাটো ৩ সুপিরিয়র ৫৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা, চাঙ্গান ডিপাল এস০৫ ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা, চাঙ্গান ডিপাল এস০৭ এসইউভি ৫৭ লাখ টাকা ও এমজি জেডএস ইভি ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।

ক্রেতাদের আস্থা বাড়াতে আমদানিকারকেরা উচ্চ ভোল্টেজের লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক মোটরের জন্য আট বছর অথবা ১ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত প্রস্তুতকারক-প্রদত্ত ওয়ারেন্টি দিচ্ছেন।

তবে সংশ্লিষ্ট মডেলের ওয়ারেন্টির শর্তাবলি অনুযায়ী এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে।

গাড়ি নিবন্ধনের বিষয়ে বিআরটিএ জানিয়েছে, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য প্রযোজ্য নিবন্ধনব্যবস্থার আওতায় নম্বরপ্লেট দেওয়া হচ্ছে। প্রচলিত অকটেনচালিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক গাড়ির বার্ষিক ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস ফি প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম বলে জানা গেছে।

পরিবেশবান্ধব গাড়ির টেকসই বাজার গড়ে তুলতে সরকার সরকারি ক্রয়ে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত নতুন নীতি অনুযায়ী, সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

এ উদ্যোগের ফলে সরকারি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং প্রশাসনিক কাজে সরকারের জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির নিরাপত্তা ও দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ড চালু করেছে। যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির বাণিজ্যিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লিথিয়াম-আয়ন অথবা লিথিয়াম আয়রন ফসফেট (এলএফপি) ব্যাটারি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এলএফপি ব্যাটারির কার্যকাল ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব ব্যাটারি ব্যবহারে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের পরিমাণও কমানো সম্ভব।

মেয়াদোত্তীর্ণ ব্যাটারির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও নিষ্পত্তি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় গাজীপুরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিপোও রয়েছে।

শহরের অ্যাপার্টমেন্ট ও বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার সমস্যা সমাধানে আবাসন ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণবিধি হালনাগাদ করেছে।

নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ইভি-উপযোগী পার্কিং ব্যবস্থা রাখার শর্ত চালু করেছে।

এ ব্যবস্থার আওতায় ভবন নির্মাণের সময়ই নির্দিষ্ট উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক তার, নিরাপত্তামূলক সার্কিট ব্রেকার ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনের প্যানেল স্থাপন করতে হবে। এতে ফ্ল্যাটের মালিকেরা পরবর্তী সময়ে সহজেই নিজস্ব বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জার স্থাপন করতে পারবেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দ্রুত চার্জিং স্টেশনের জন্য পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বেসরকারি পরিচালকেরা সেবামূল্যসহ প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৬ থেকে ১৯ টাকা নেন। গাড়ি ও চার্জিং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এসব স্টেশনে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিটে ব্যাটারির ৮০ শতাংশ চার্জ দেওয়া যায়।

একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক গাড়ি সম্পূর্ণ চার্জ করতে প্রায় ৩০০ থেকে ৭৫০ টাকা খরচ হয়। এতে গাড়ির মডেল, ব্যাটারির ধারণক্ষমতা ও চালানোর পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। তবে মহাসড়কে দ্রুত চার্জিং স্টেশনের সীমিত উপস্থিতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এ সমস্যা সমাধানে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে ১ হাজার ২০০টি বাণিজ্যিক দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ বিভাগের যৌথ অর্থনৈতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি ব্যক্তিগত বৈদ্যুতিক গাড়ি বছরে গড়ে ৪.৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ রোধ করে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি চলাচলের সময় কোনো দূষণকারী গ্যাস নিষ্কাশন করে না এবং প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির তুলনায় অনেক কম শব্দ সৃষ্টি করে। ফলে এসব গাড়ির ব্যবহার বাড়লে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে বায়ুমানের উন্নয়ন এবং শব্দদূষণ কমাতে সহায়তা করবে।

সরকারের কৌশলগত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎচালিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জিত হলে জ্বালানি আমদানি কমানো ও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।