১৫০ আসনের নির্বাচন ইভিএমে: ইসি

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে গতকাল সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করতে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ, সেনা মোতায়েনসহ সাতটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যুগ্ম সচিব এসএম আসাদুজ্জামান এ তথ্য জানান। মূলত সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে তারা ওই সুপারিশগুলো করে।
সুপারিশসমূহ-

১। ভোট দান প্রক্রিয়া:
ইভিএম বিষয়ে সাহায্যের জন্য প্রতি বুথে একজন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনএসসিসি, সেনাবাহিনীর মত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

২। নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
(ক) সব নির্বাচনে আশংকাযুক্ত এলাকাসমূহে সেনাবাহিনী মোতায়ন করা যেতে পারে।
(খ) প্রতি নির্বাচনী এলাকার জন্য সেনা/র‍্যাব এর মোবাইল টিমের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
(গ) জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনে অবশ্যই সবগুলো এলাকাতে নির্বাচন দিনের কমপক্ষে ৭ দিন আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। এমনকি প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়ন করা যেতে পারে।

৩। আচরণ বিধি:
(ক) প্রার্থী, রাজনৈতিক দল, দলীয় প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী, এমপি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি গাড়ী, সার্কিট হাইজ, প্রচারমাধ্যম, সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করছে তা বন্ধ করতে নির্বাচনী বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
(খ) নির্বাচন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারী, সংস্থা, দায়িত্ব পালন এবং ব্যাপক জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা।

৪। ভোট গণনা:
(ক) স্বচ্ছতার জন্য ভোট গণনার সময় প্রার্থীদের প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৫। ভোট কেন্দ্রের উপকরণ:
(ক) সব বুথে আলোর ব্যবস্থা করা এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের বসার সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা উচিত।
(খ) ভোটারদের হাতের আঙ্গুল লেপনকারী আমোচনীয় কালি আরও উন্নতমানের হওয়া উচিত।

৬। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও পর্যবেক্ষক:
(ক) পর্যবেক্ষকদের জন্য নির্বাচনী ফ্যাক্টশীট ও গণনা শেষে রেজাল্ট সরবরাহ দেওয়া প্রয়োজন।
(খ) স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা তথা সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ প্রতিবেদন প্রদানের জন্য প্রতি কেন্দ্রে কমপক্ষে ১ জন পর্যবেক্ষক সার্বক্ষণিক অবস্থানের অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।
(গ) কমিশন প্রদেয় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ফরম (ই ও-৪) কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ দিয়ে শৌচাগার, পানি সমস্যা, ভোটদান প্রক্রিয়া, ভোট কাস্টিং, রেটিং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আচরণ, যথার্থ নিয়মে ভোট গণনা, পোলিং এজেন্টদের ভূমিকা, প্রার্থী ও প্রার্থীদের পক্ষের লোকজনের ভূমিকা, বিজয়ী পক্ষের সমর্থকদের ও বিজিত পক্ষের সমর্থকদের আচরণের চিত্র তুলে ধরার জন্য ছক সম্বলিত ফরম করলে ভালো হবে।

৭. নির্বাচন ও ভোট প্রদানে করণীয়:
(ক) ভোটার শিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা; এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত কুসিক নির্বাচনে মোট ৭টি স্থানীয় পর্যবেক্ষক সংস্থার ৯২ জনকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। তারা মোট ১০৫টি ভোটকেন্দ্রসহ সার্বিক নির্বাচনী এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। সংস্থাগুলো হলো- জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ-জানিপপ, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা, বিবি আছিয়া ফাউন্ডেশন, রিহাফ ফাউন্ডেশন, সমাজ উন্নয়ন প্রয়াস এবং মানবাধিকার ও সমাজনউন্নয়ন সংস্থা-মওসুস।

এসব পর্যবেক্ষক সংস্থার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে ও ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ভোটারদের মাঝে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন ব্যক্তিদের কেন্দ্রের আশেপাশে ভিড়তে দেখা যায়নি। এ নির্বাচনে ইভিএম সম্পর্কিত
কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বয়স্ক ও ইভিএম সম্পর্কে অনভিজ্ঞদের ভোট প্রদানে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লেগেছে।

সংস্থাগুলো তাদের প্রতিবেদনে জানায়- পর্যবেক্ষণকৃত ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন। ভোটের দিন ভোটারগণ অবাধে ভোটকেন্দ্রে যাতায়াত করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল। ভোট গণনা কক্ষে একের অধিক প্রার্থীর এজেন্ট উপস্থিত ছিলেন। সব কেন্দ্রের ভোটগণনার বিবরণী কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ডে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ভোটগণনার বিবরণী কপি কেন্দ্রেই এজেন্টকে সরবরাহ করা হয়েছিল।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেন্দ্রগুলোতে কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত গণমাধ্যমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্টদেরকে ভোটগণনার সময়ে নিরপেক্ষভাবে ভোটগণনা করতে দেখা গেছে।

নির্বাচনটি দুই/একটি ছোট-খাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল আর শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেই শেষ হয়েছে। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পূর্ণ ইভিএমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভোট সমাপ্তির পর যথাযথ নিয়মেই ফলাফল প্রস্তুত ও ঘোষণার কার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু ১০৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টি কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর সুশৃঙ্খল চিত্র কিছুটা পাল্টে যায়। লোডশেডিংয়ের কারণে চলে যায় বিদ্যুৎ, নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা স্থলে বেধে যায় হট্টগোল, পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এতে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল ঘোষণায় কিছুটা অসুবিধা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সব কেন্দ্রের ফলাফল সঠিকভাবে ঘোষণা করা সম্ভব হয়।

এছাড়া কুমিল্লা নগরীর ৫ নম্বর ওয়াডের্র কুমিল্লা হাইস্কুলের মহিলা ভোটার কেন্দ্রে ইভিএম ত্রুটি দেখা দেয়। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এ ভোটগ্রহণের ধীরগতির অভিযোগ ছিল। সকালে কয়েক দফা বৃষ্টির কারণে ভোটগ্রহণে কিছুটা বিপত্তি ঘটে। দুপুরের পরে কেন্দ্রে নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে আন্তরিক পরিবেশে ভোট প্রদান করেছেন ভোটারগণ।

কুমিল্লা নগরীর ওহিদুল্লাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও একটি ইভিএম এ ত্রুটি দেখা দেয়। ওই কেন্দ্রের ছয়টি বুথের মধ্যে ১ নম্বর বুথে ইভিএম মেশিনটি সকালে ভোটের শুরুতেই বিকল হয়ে যায়। এতে ৪২ মিনিট কোনো ভোটগ্রহণ হয়নি। পরে মোবাইল কারিগরি টিম এসে বিকল মেশিনটি পরিবর্তন করে দিলে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

নির্বাচনে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা, প্রভাব বিস্তার ও আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে ১১ বহিরাগতকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

কুসিক নির্বাচনে দুই বারের মেয়র মনিরুল হক সাক্কুকে হারিয়ে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। তবে ১০১ নম্বর কেন্দ্রের ফল ঘোষণার পর কারচুপির করার অভিযোগ তুলে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সাক্কু।

তারও আগে, নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন কমিশনাররা জানান,

১. সকল দল বিশেষ করে প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের মতামত হচ্ছে, কমিশন নির্বাচনে সকল দলের বিশেষত প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করে। নির্বাচন কমিশন কোনো দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে না এবং সে ধরনের কোনো প্রয়াস নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করবে না। তবে সকল দলকে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আহ্বান শেষ পর্যন্ত আন্তরিকভাবেই বহাল থাকবে।

২. সঠিক ফলাফল নিশ্চিতকরণ, পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ সংক্রান্ত দলগুলোর প্রস্তাবের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হচ্ছে, সংবিধান, আইন ও বিধি-বিধানের অধীনে প্রদত্ত সকল ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করে ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে সৃষ্ট সকল বাধা ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিষ্ঠা করে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি করতে কমিশন সব উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সেই সঙ্গে কারচুপির সম্ভাব্য সকল সুযোগ প্রতিরোধ করে সঠিক ও নিরপেক্ষ ফলাফল নিশ্চিত করতে সততা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কমিশন কাজ করে যাবে। নির্বাচনে জয় পরাজয় অনিবার্য। প্রার্থীদের জয়পরাজয় মেনে নিতে হবে। পরাজয় মেনে না নেওয়ার মানসিকতা পরিত্যাগ করতে হবে। প্রার্থীরা প্রতিটি কেন্দ্রে কর্মী রেখে সক্রিয়ভাবে প্রতিটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সৃষ্ট ভারসাম্য অর্থশক্তি ও পেশিশক্তির ব্যবহার ও প্রভাব অনেকাংশে প্রতিরোধ করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।

৩. ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত সুপারিশের ক্ষেত্রে কমিশন সিদ্ধান্ত হলো- দেশি এবং বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ভোট পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে। ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ অবাধ, নির্বিঘ্ন, স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করতে ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে সিসি ক্যামেরা প্রতিস্থাপন করে ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরভাগের দৃশ্য বাহির থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ, সামর্থ্য সাপেক্ষে দেওয়া হবে।

৪. একাধিক দিনে নির্বাচন ও সেনা নিয়োগের বিষয়ে সিইসি বলেছেন- একাধিক দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে কিনা, হলে তা কীভাবে সম্ভব হবে, দিনের ফলাফল দিনশেষে প্রকাশ করা হবে কিনা, করা হলে তা পরের নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন রয়েছে।

দেশে একই দিনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয় বিধায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকাজে নিয়োজিত অসামরিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যা অপর্যাপ্ত বা অপ্রতুল হতে পারে। একারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকাজে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাবনাটি যৌক্তিক বলে কমিশন মনে করে।

৫. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) বিষয়ে কমিশন মনে করে- ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি এবং সমর্থন দুই-ই রয়েছে। কমিশন তা শ্রবণ করেছে এবং মতবিনিময় করেছে। ইভিএম-এর ব্যবহার নিয়ে ইতোপূর্বে সকল দলের (কতিপয় দল অংশগ্রহণ করেনি) আমন্ত্রিত প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সংলাপ ও কর্মশালা করা হয়েছে। এছাড়া বুয়েটসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি বিষয়ে সর্বজনবিদিত বিশিষ্ট অধ্যাপকদের অংশগ্রহণে একাধিক সংলাপ ও কর্মশালা করা হয়েছে। যেহেতু সদ্য সমাপ্ত রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়াও ইতিপূর্বে ইভিএম নিয়ে আরো সংলাপ, কর্মশালা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে এবং যেহেতু কমিশন ইভিএম-এর সার্বিক বিষয়ে এখনো স্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। এটি নিয়ে কর্মশালা, মতবিনিময়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে তার সার্বিক ফলাফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণ করে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার বিষয়ে কমিশন যথাসময়ে অবহিত করবে। ব্লক চেইন পদ্ধতিতে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসে ই-ভোট প্রদানের প্রস্তাবটি আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রয়োগ সম্ভব নয়।

৬. অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল, এক মঞ্চে প্রচার ও ঋণ খেলাপির বিষয়ে সিইসি তার প্রতিবেদনে বলেছেন- অনলাইনে নমিনেশন পেপার দাখিল গ্রহণের সুযোগ বা বিধান বর্তমানে আরপিওতে রয়েছে। একই মঞ্চ থেকে সকল দলের প্রার্থীদের বক্তব্য দানের এবং প্রচারণার নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করার, নির্ধারিত স্থানে সকল প্রার্থীর পোস্টার লাগানোর ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে একই পোস্টারে সকল প্রার্থীর প্রচারণার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব আধুনিক। এতে নির্বাচনী ব্যয় কমে আসতে পারে। নির্বাচনী সহিংসতা হ্রাস পেতে পারে। রাজনীতিতে সম্প্রীতির নতুন সংস্কৃতির প্রচলন হতে পারে। ইউটিলিটি বিল বাকি থাকার কারণে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বিষয়ক বিধানটি যৌক্তিক করার বিষয়ে কমিশন বিবেচনা করবে।

৭. নির্বাচনকালীন সরকার সংশ্লিষ্ট সংলাপে আসা সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন মনে করে নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের অধীনে ন্যস্ত করার বিষয়টিও সংবিধানের আলোকে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। তবে, কমিশন মনে করে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতা-বিবর্জিত নির্বাচনের প্রয়োজনে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনে যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ওপর কমিশনকে দেওয়া আছে। সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ অবহিত ও সচেতন থাকবে এবং কোনো মহল থেকে সেগুলোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা বা বাধা সৃষ্টি যাতে না করা হয়, সংশ্লিষ্ট সকল নির্বাহী বিভাগকে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব হিসেবে সেগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

৮. ক্ষমতাসীন দলের বাধা, মিথ্য মামলার বিষয়ে কমিশন মনে করে সাধারণ মানুষদের মধ্যে এমন একটি ধারণা বা বিশ্বাস প্রবল। কমিশন দৃঢ়ভাবে আরও বিশ্বাস করতে চায় সরকারি দল এ ধরনের নির্বাচন আচরণ বিধি ভাঙার মতো কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং রাজনৈতিক কারণে কোনো মামলা করে সুস্থ গণতন্ত্র চর্চার পথ বন্ধ করবে না। এক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন সময়ে সকল অংশীজনের কার্যকলাপ কমিশন গভীর পর্যবেক্ষণে রাখবে।

৯. সংখ্যানুপাতিক সংসদীয় ব্যবস্থার সুপারিশের বিষয়ে সিইসি জানান, কমিশন পরামর্শটি গুরুত্বসহকারে শ্রবণ ও বিবেচনা করেছে। তবে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) ও দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা (Bicameral Legislature) গঠন করা, সংসদ সদস্যের সংখ্যা বর্ধিত করা এবং নারী আসনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাবনাটি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকার এবং জাতীয় সংসদের এখতিয়ারাধীন বলে কমিশন মনে করে।

১০. ক্ষমতা প্রয়োগের সুপারিশের বিষয়ে কমিশন বরাবরের মতো প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলতে চায় যে, সংবিধানের অধীন গৃহীত শপথের প্রতি অনুগত থেকে সৎ, নিরেপক্ষ ও সাহসিকতার সঙ্গে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে সংবিধান ও আইনে প্রদত্ত ক্ষমতা সততা ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে বদ্ধপরিকর।