ইন্দোনেশিয়ায় স্কুলের ফ্রি-মিল খেয়ে ৮ শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের ফ্ল্যাগশিপ ফ্রি-মিল (বিনামূল্যের খাদ্য) কর্মসূচির খাবার খেয়ে চলতি সপ্তাহে দেশটির জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপে তিনটি পৃথক ঘটনায় আটশ’রও বেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। বমি বমি ভাব, বমি ও পেটে তীব্র ব্যথা নিয়ে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্টের এই প্রধান কর্মসূচি ঘিরে বিতর্ক ও সমালোচনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

অপুষ্টি দূর করার লক্ষ্যে গত বছর ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি প্রাবোও সুবিয়ান্তো দেশের ৬ কোটি ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এবং গর্ভবতী নারীর জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের এই বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ প্রকল্প চালু করেছিলেন। তবে শুরু থেকেই এই বৃহৎ নীতিটি বারবার খাদ্য বিষক্রিয়া, দুর্নীতির অভিযোগ, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং বাজেট ঘাটতির অভিযোগসহ নানা বিতর্কে জর্জরিত হয়ে পড়েছে।

চলতি সপ্তাহের ঘটনায় পূর্ব জাভার সিদোয়ারজোতে খাবার খাওয়ার পর ৫৬৬ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে, যাদের মধ্যে ৮৮ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হয়। একই অঞ্চলের এনগাঞ্জুকে বুধবার ফ্রাইড রাইস, মুরগির মাংস ও তোফু খাওয়ার পর ৪৯ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। এছাড়া স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একই দিনে পশ্চিম সুমাত্রার আগামে আরও ২৩৭ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন, যেখানে ডিমকে এই বিষক্রিয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে।

অসুস্থতার ঘটনার পর আগাম অঞ্চলের স্থানীয় সরকার মূল্যায়নের অজুহাতে খাদ্য বিতরণ আপাতত স্থগিত করেছে এবং সিদোয়ারজোর ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট রান্নাঘরটির কার্যক্রমও বুধবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বিগত এক বছর ধরে এই কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। টেম্পেতে পোকা, চালে কাচের টুকরো এবং নোংরা পানিতে থালাবাসন ধোয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন অনেকে। শিক্ষা নজরদারি সংস্থা ‘নেটওয়ার্ক ফর এডুকেশন ওয়াচ’-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ আগস্ট পর্যন্ত এই খাবার খেয়ে প্রায় ৩৭ হাজার ৬০০ মানুষ খাদ্য বিষক্রিয়ার শিকার হয়েছেন।

সরকারবিরোধী একমাত্র রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য চার্লস হনোরিস পুরো পরিস্থিতিকে ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে, জাতীয় পুষ্টি সংস্থা পূর্বে ঘটে যাওয়া বিষক্রিয়ার ঘটনাগুলোর জন্য খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা এবং রান্না করা খাবার পৌঁছাতে দেরি হওয়াকে দায়ী করেছে।

তবে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও এই সংকটকে খুব একটা বড় করে দেখতে নারাজ। প্রাবোও সুবিয়ান্তো বিষক্রিয়ার ঘটনাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, এ পর্যন্ত পরিবেশন করা শতকোটি খাবারের মধ্যে বিষক্রিয়ার হার মাত্র “০.০০১৭ শতাংশ ; যা বেশ গর্ব করার মতো একটি সাফল্য।” এই নীতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি এবং পড়াশোনার মান বাড়িয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

জুলাই মাসে গবেষণা সংস্থা সাইফুল মুজানি রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিংয়ের এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই প্রকল্পে সন্তুষ্ট, যার প্রধান কারণ বারবার ঘটা খাবার বিষক্রিয়া।

তবে নানামুখী সমালোচনা সত্ত্বেও গত মাসে সংসদে দেওয়া বক্তব্যে প্রাবোও কর্মসূচিটি চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, আমরা একদম মৌলিক বিষয় পুষ্টি দিয়েই শুরু করছি। আমাদের শিশুরা ক্ষুধার্ত পেটে পড়াশোনা করতে পারে না। কোনো শিশুই ক্ষুধার্ত থেকে সঠিকভাবে শিখতে পারে না। প্রতি চারজন ইন্দোনেশীয় শিশুর একজন অপুষ্টি বা স্টান্টিংয়ে ভুগবে – এই পরিস্থিতি আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আমরা এটা হতে দেব না।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান