বাতাসে লাশের গন্ধ, হৃদয়ে শোকের পাহাড়; নিখোঁজ স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় নেপাল

হিমালয়ের পর্বতমালায় হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া আকস্মিক প্রলয়ঙ্করী প্লাবনে নেপাল এবং তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই জলোচ্ছ্বাসে নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলে মোট ১২০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, সরকারি ও বেসরকারি নিখোঁজের পরিসংখ্যানে নেপালেই ৫০০০ জনের বেশি এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে ৫৪৬ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম পরিবেশ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক অঞ্চলে এখনো পৌঁছাতে সক্ষম হননি।

ঘটনার দিন সকালে হিমালয়ের উঁচুতে সীমান্ত এলাকায় এক বিশাল হিমবাহ ধসে পড়ে এক প্রকাণ্ড কালো জলের স্রোত নেপালের ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদী উপত্যকা দিয়ে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে নেমে আসে। সকাল ৮:৩৭ মিনিটে এই বিপর্যয়ের সূচনা ঘটে এবং মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যে ৮:৫০ মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ বেত্রাবতী বাজার ও আশপাশের বসতি প্রলয়ঙ্করি কাদাজলে তলিয়ে যায়। মানুষ নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে উঁচু পাহাড় ও জঙ্গলের দিকে ছুটে যান। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ত্রিশূলী নদীর ওপর থাকা সেতুগুলো পানির তোড়ে ভেঙে ভেসে যায় এবং নদীটি তার পুরোনো গতিপথ বদলে হাইওয়ের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। বেত্রাবতীতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ এত পুরু স্তর তৈরি করেছে যে ছয়তলা ভবনের কেবল ওপরের দুই তলা দৃশ্যমান রয়েছে। পুরো এলাকা ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে; উল্টে থাকা স্কুলের বাস, দুশো মিটার দূরে ভেসে যাওয়া মুদি দোকান এবং মানুষের ব্যবহার্য চশমা, ওষুধ, থালাবাসন ও বইপুস্তক কাদায় মিশে আছে। কেবল বেত্রাবতী এলাকাতেই অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বেত্রাবতীর ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা দিল বাহাদুর শ্রেষ্ঠা নিজের ৫০ বছরের জীবনসঙ্গিনী যমুনা শ্রেষ্ঠাকে কাদার নিচে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। ঘটনার সময় যমুনা ঘরের প্রিয় হাঁস-মুরগি ও ছাগলগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কালো বিশাল ঢেউ এসে তাদের ঘরবাড়ি তছনছ করে দেয়। নিজের চোখে দুটি সেতু ভেঙে পড়তে দেখা দিল বাহাদুর বলেন, যখন ধাক্কাটা এলো, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। তিনি এখনো খালি হাতে মাটি ও কাদা খুঁড়ে স্ত্রীর মৃতদেহ খোঁজার চেষ্টা করছেন। এই দম্পতি ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরও নিজেদের বসতবাড়ি নতুন করে তৈরি করেছিলেন। স্ত্রীর স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি জানান, এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে নেই, মনে হয় সে হয়তো এখানেই কোথাও হেঁটে বেড়াচ্ছে এবং তার হাঁস-মুরগি ও ছাগলগুলোর দেখাশোনা করছে। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের হারিয়ে তিনি এখন নিজেকে পুরোপুরি একাকী ও নিঃস্ব অনুভব করছেন।

একই এলাকার ৫৭ বছর বয়সী সান্তামায়া লাওয়াত মাত্র ১০ মাস আগে তার সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে যে নতুন বাড়িটি তৈরি করেছিলেন, তা কাদার নিচে পুরোপুরি চাপা পড়েছে। নিজের ৫ জন স্বজনকে হারানো সান্তামায়া তার ভাইয়ের অর্ধভাঙ্গা বাড়ি থেকে সামান্য কিছু জামাকাপড় ও কম্বল কাদা ঝেড়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন। তিনি ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, যে বাড়িটিতে সারা জীবন কাটানোর কথা ছিল, তা আজ কাদার স্তূপে পরিণত হয়েছে। স্বপ্নের মতো সুন্দর এলাকাটি এখন যেন নরকে পরিণত হয়েছে।

বেত্রাবতী থেকে আরও উত্তরে তিব্বত সীমান্তবর্তী রসুয়া জেলার পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সেখানকার বহু গ্রাম সম্পূর্ণ মানচিত্র থেকে মুছে গেছে এবং স্থলপথে যোগাযোগের সব মাধ্যম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অনেক গ্রামে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দলের হেলিকপ্টার। সীমান্ত সংলগ্ন তিমুরে গ্রামে উদ্ধারকারী দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে ইতোমধ্যে ৯০টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ রসুয়া জেলার স্যাব রু বেসি নামক পর্বতের পাশের গ্রামটি প্রায় পুরোপুরি নদীর কাদা ও পাথরে তলিয়ে গেছে। গ্রামটির মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫০০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং সেখানে কেবল একটি মাত্র ভবন অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

স্যাব রু বেসি গ্রাম থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা ৫০ বছর বয়সী কৃষক ছিরিং দর্জি জানান, তারা ১৫-১৬ জন লোক কোনোক্রমে জঙ্গল ও পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে কোনো খাবার ছিল না; বনের পানি খেয়ে দুই দিন কাটানোর পর সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার তাদের উদ্ধার করে ধুনচে সেনাশিবিরে নিয়ে আসে। ছিরিং দর্জি তার ৯ বছর বয়সী নাতনি রিতু তামাংকে নিয়ে কাঠমান্ডু যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তাদের পরিবারের ৫ জন সদস্য এখনো নিখোঁজ। ছোট্ট রিতু জানায়, তাদের ঘরের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, যে স্কুলে সে প্রথম শ্রেণিতে পড়ত, সেই স্কুল ও তার শিক্ষকেরা সবাই ভেসে গেছেন।

দুর্যোগের কারণে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কাঠমান্ডু থেকে রসুয়া যাওয়ার একমাত্র যে পথটি অবশিষ্ট আছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক, কাদা ও পাথরে ভরা এক কাঁচা সড়ক, যা পার হতে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে। বহু ত্রাণের ট্রাক ধুনচে এলাকায় আটকা পড়ে আছে এবং উত্তর দিকে যেতে পারছে না। বেত্রাবতী ও ধুনচের মাঝামাঝি স্থানে ধুলিখেল হাসপাতালের পক্ষ থেকে একটি ত্রাণ শিবির ও চিকিৎসাকেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে অসংখ্য শিশু এসেছে যাদের বাবা-মা এই বন্যায় ভেসে গেছেন। স্থানীয় নীলকণ্ঠ স্কুলের শিক্ষক প্রকাশ নেপাল জানান, তাদের স্কুলের অন্তত ২০০ জন শিক্ষার্থী ঘটনার সময় হেঁটে স্কুলে আসার পথে নিখোঁজ হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই ৫ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশু। তবে ভাগ্যক্রমে একটি স্কুলের বাসকে মাত্র ১০ মিনিট আগে বন্যা আসার বার্তা জানিয়ে থামানো সম্ভব হয়েছিল, যার ফলে বাসটিতে থাকা শিশুরা অল্পের জন্য রক্ষা পায়। কিন্তু রাস্তায় হেঁটে আসা শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি, কারণ এই পরিবারের অনেকেই ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর নদীর তীরে অস্থায়ী বসতিতে বসবাস করছিলেন।

এই চরম শোক ও করুণ পরিস্থিতির মধ্যেও দু-একটি অলৌকিক জীবনরক্ষার গল্প আশার আলো দেখাচ্ছে। ল্যাচিয়াং গ্রামের ৬৯ বছর বয়সী রামকৃষ্ণ নেউমানে এবং তার স্ত্রী ৬৬ বছর বয়সী মুইয়া নেউমানে তাদের একমাত্র ছেলের বেঁচে ফেরার কথা জানান। তাদের ছেলে স্যাব রু বেসি এলাকায় পশু চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন। বন্যা আঘাত হানার পর দুই দিন তার কোনো খোঁজ না পেয়ে মা-বাবা ধরে নিয়েছিলেন ছেলে আর বেঁচে নেই। কিন্তু দুই দিন পর কাঠমান্ডুর এক হাসপাতাল থেকে যখন ছেলে ফোন করে জানায় যে সেনাসদস্যরা তাকে জীবিত উদ্ধার করেছে, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। প্রকৃতির এই তাণ্ডব ও স্বজন হারানোর বেদনায় নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এখন শুধুই হাহাকার ও শোকের ছায়া।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান