কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উইলেস্টন জলাশয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক অলৌকিক ও বিস্ময়কর ঘটনায় পুরো বিশ্বজুড়ে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। জনমানবহীন এক দুর্গম কৃত্রিম হ্রদের বুদ্বুদের মতো হঠাৎ করেই জেগে উঠেছিল সুবিশাল এক ভাসমান দ্বীপ, যার বুকজুড়ে ছিল সবুজ বৃক্ষরাজি। আর তারচেয়েও তাজ্জব বিষয় হলো, চোখ জুড়ানো সেই রহস্যময় ভাসমান ভূখণ্ডটি কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আবার হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!
ম্যাকেঞ্জি শহরের উত্তরাঞ্চলের বিশাল কৃত্রিম জলাশয় উইলেস্টন জলাশয়ে গত মাসে স্থানীয় এক নৌকোহোরা প্রথম এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যের মুখোমুখি হন। তিনি তড়িঘড়ি করে সেই বিরল দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন এবং ফুটেজটি স্থানীয় বাসিন্দা রকি অ্যাভেরির হাতে তুলে দেন। রকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সেই রহস্যময় দ্বীপের ভিডিও ও ছবি পোস্ট করতেই মুহূর্তের মধ্যে তা ভাইরাল হয়ে যায় এবং ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের নজর কাড়ে। ঘটনাটি নিয়ে সিবিসি-র কাছে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে অবাক কণ্ঠে রকি অ্যাভেরি বলেন, আমার ৪০ বছরের জীবনে এই দেশে আমি কখনো এমন অলৌকিক ও অভাবনীয় দৃশ্য দেখিনি। এটা সত্যিই এক আশ্চর্যজনক অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি আরও বলেন, সামনে একটি বড় ধরনের মাছ ধরার প্রতিযোগিতা ছিল, তাই সবাই যেন সতর্ক থাকে সেই উদ্দেশ্যেই আমি এটি শেয়ার করি। তাছাড়া বিসি হাইড্রো সংস্থাকেও বিষয়টি জানানোর প্রয়োজন মনে করেছি, যেন দ্বীপটি তাদের বাঁধের দিকে ভেসে গেলে কোনো বিপদ না ঘটে।
কানাডার সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘বিসি হাইড্রো’ যখন প্রথম এই দ্বীপটির কথা শোনে, তখন তারা বিষয়টি পুরোপুরি বিশ্বাসই করতে চায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র বব গ্যামার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমরা আগে কখনো এমন ঘটনা শুনিনি। প্রথমদিকে খুব কম সংখ্যক মানুষ এর খবর জানানোয় দ্বীপটির সঠিক অবস্থান শনাক্ত করা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জুলাইয়ের ২১ তারিখের স্যাটেলাইট চিত্র। ছবিতে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ডব্লিউ এ সি বেনেট বাঁধের প্রায় ৬০ মাইল পশ্চিমে ফিনলে বে-র মূল জলাশয়ে সুবিশাল সেই দ্বীপটি ভাসছে। গবেষকদের মতে, ভাসমান দ্বীপটি ছিল প্রায় ২৩০ ফুট চওড়া এবং ৪৬০ ফুট দীর্ঘ, যার মোট আয়তন প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার বর্গফুট। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএল ফুটবল মাঠের প্রায় দুটির সমান একটি দানবীয় ভূখণ্ড পানির ওপর ভেসে বেড়াচ্ছিল! কিন্তু রহস্যের এখানেই শেষ নয়; গত ৫ আগস্টের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, পুরো দ্বীপটি হ্রদের বুক থেকে একেবারে উধাও হয়ে গেছে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের কৌতুহল আর নানামুখী তত্ত্বের জোয়ার উঠেছে। গাছের শিকড় ও গঠন নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে এক অনুরাগী লিখেছেন, এস্পেন পপলার গাছগুলো মূলত একটি প্রধান মা-গাছের শিকড় থেকে তৈরি ক্লোন বা ডালপালা নিয়ে বিশাল গুচ্ছ তৈরি করতে পারে। ফলে তাদের সব শিকড় একে অপরের সাথে পেঁচিয়ে থাকে এবং প্রতিটি গাছকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির মাধ্যমে যুক্ত রাখে।
চরম দাবদাহ থেকে বাঁচার আকুতি জানিয়ে আরেক মন্তব্যকারী রসিকতা করে লিখেছেন, যদি আমি এই দ্বীপটির সন্ধান পাই, তবে আগামী সপ্তাহেই সেখানে চলে যাব। এই তীব্র দাবদাহ থেকে তো অন্তত রেহাই পাব! অন্য একজন প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ দিয়ে মন্তব্য করেছেন, গাছগুলো যেভাবে পানির ওপর দুলছিল, তাতে মনে হচ্ছে এই ‘দ্বীপ’টি আসলে কাটা বা উপড়ে পড়া অনেকগুলো কাঠের গুঁড়ির একত্রিত রূপ। দীর্ঘ সময় ধরে জমা হওয়া এই কাঠের স্তূপের ওপর নতুন করে চারা গজিয়ে হয়তো আজকের এই রূপ নিয়েছে।
আর রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে নিজের একটি আলাদা জগৎ গড়ার স্বপ্ন বুনে চতুর্থ একজন লিখেছেন, দূর ছাই, আমার মনে হয় আবার ওখানে ফিরে গিয়ে দ্বীপটির মালিকানা দাবি করা উচিত! যেহেতু এটা কোনো প্রকৃত স্থায়ী ভূখণ্ড নয়, তাই সরকারও কিছু বলতে পারবে না। এর পেছনে একটা আউটবোর্ড ইঞ্জিন লাগিয়ে দিলেই ব্যাস, খেলা খতম!
সূত্র: এনডিটিভি





