লঞ্চ কেটে ওজন দরে বিক্রি লঞ্চ মালিকরা

বুড়িগঙ্গা নদীর দুই তীরে অন্তত আটটি লঞ্চ কেটে ওজন দরে লোহা হিসেবে বিক্রির কাজ চলছে। যাত্রীবাহী এসব লঞ্চ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত চলাচল করত। পদ্মা সেতু হওয়ার পর যাত্রী উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় লোকসান থেকে বাঁচতে লঞ্চ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন মালিকরা। বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই সময়ে লোহার দামও তুলনামূলক বেশি।

রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এলাকায় গিয়ে লঞ্চ কাটার এই দৃশ্য সহজে চোখে পড়ে। কেটে ফেলা লঞ্চগুলো সৌদিয়া, রাজধানী, প্রিন্স আওলাদ, শাকিলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। আকারে এগুলো ছোট ও মাঝারি বলে মালিকরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) তথ্য বলছে, আগে ঢাকার সদরঘাট থেকে গড়ে ৯৫টি লঞ্চ দক্ষিণের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যেত। সেই সংখ্যা এখন কমে গড়ে ৬৫টিতে নেমে এসেছে। আর যাত্রী কমেছে ৩৫ শতাংশ।

যদিও লঞ্চ মালিক সমিতির সূত্র বলছে, সদরঘাট থেকে আগে নিয়মিত ৪১ রুটে লঞ্চ চলাচল করত। এখন ৩৮টি রুটে চলছে। রুটের সংখ্যা তেমন না কমলেও কমেছে যাত্রী ও লঞ্চের সংখ্যা। আগে প্রতিদিন ১৩০টি পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল করত। এখন কোনো কোনো দিন ৩০টিও চলাচল করে না।

আর যাত্রী কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কপথে যাতায়াতের সুবিধা বাড়ায় নৌপথে যাত্রী কমছে। বিশেষ করে ছোট নৌপথে ছোট-মাঝারি ধরনের লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমেছে। ভাড়া বাড়ালে যাত্রী আরো কমে যাচ্ছে। কিন্তু লোকসানও সহনীয় রাখা যাচ্ছে না।

সরেজমিনে সদরঘাটে গিয়েও চিরচেনা সেই হাঁকডাক, কোলাহল, যাত্রী নিয়ে টানাটানি দৃশ্য দেখা গেল না। মাস চারেক আগেও মধ্য দুপুর থেকেই স্বাভাবিক নিয়মে যাত্রীর আনাগোনা শুরু হয়ে যেত সদরঘাটে। সেই চিত্র একেবারে বদলে গেছে।

সদরঘাট থেকে মাইল তিনেক দক্ষিণে গেলে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট। সেখানে নতুন ধরনের ব্যস্ততা চোখে পড়বে। রাত-দিন কাটা হচ্ছে লঞ্চ। কয়েকজন শ্রমিক কেটে ছোট ছোট টুকরা করছেন কামাল-১ নামের লঞ্চটি। লঞ্চটি ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচল করত। এর আগের নাম কীর্তনখোলা-১।

রহমত আলী নামের এক শ্রমিক জানান, তিন সপ্তাহ ধরে লঞ্চটি ভাঙার কাজ চলছে। ১২ থেকে ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। এটি পুরোপুরি টুকরা করতে এক মাস লাগতে পারে।

লঞ্চ কাটার ঠিকাদারি নিয়েছেন মো. আপন খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, লঞ্চের সব লোহা কেজি দরে বিক্রি করা হবে। এখনকার বাজারমূল্যে প্রতি কেজি জাহাজ ভাঙা লোহা ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আপন জানালেন, এই লঞ্চ থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ টন লোহা পাওয়া যাবে। এই পরিমাণ লোহার দাম আনুমানিক সাড়ে তিন কোটি টাকা হতে পারে বলে আপনের ধারণা।

কেন লঞ্চ ভেঙে ফেলা হচ্ছে

কামাল-১-এর পাশে ভাঙার অপেক্ষায় আছে এমভি দোয়েল-২ নামের আরেকটি লঞ্চ। এর কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না। আকারে ছোট লঞ্চটি।

লঞ্চ মালিক সমিতির অফিসে গিয়ে কথা হয় ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালীর মধ্যে চলা অভিযান লঞ্চের মালিক মো. হামজালাল শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, যাত্রী কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে। একটা ছোট লঞ্চে এক লাখ টাকা খরচ বেড়ে গেছে। বড় লঞ্চে দুই লাখ টাকা। কিন্তু ভাড়া বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ যাত্রী আরো কমে যাবে। ফলে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে স্বল্প দূরত্বে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

সদরঘাট থেকে তালতলীর কাঠপট্টি পর্যন্ত ছোট এই নৌ রুটে একসময় ৭০ থেকে ৮০টি লঞ্চ নিয়মিত চলাচল করত। এখন এই নৌপথে লঞ্চের সংখ্যা চারে নেমেছে বলে দাবি করলেন এই রুটে চলাচল করা বন্ধন-৮ লঞ্চের মালিক শৈলেন বাবু। তিনি বলেন, যেসব রুট বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলোর লঞ্চ কেটে বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিছুটা হলেও প্রাপ্ত টাকা অন্য খাতে বিনিয়োগ করা যাবে।

শৈলেন বাবু বলেন, শুধু ঢাকা দিয়েই বিচার করলে হবে না, মাওয়া থেকে কাওড়াকান্দি ও মাঝিকান্দি—এই দুই নৌপথে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার আগেও নিয়মিত ৭৪টি লঞ্চ চলাচল করত। এখন মাত্র ১১টি লঞ্চ চলছে। বাকি লঞ্চগুলোর মধ্যে কিছু উত্তরাঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু অনেক লঞ্চ বসে থেকে নষ্ট হচ্ছে। এই লঞ্চগুলো আকারে ছোট। বেশি দূরত্বের রুটে চলতে পারবে না। তাই ফেলে নষ্ট করার চেয়ে ভেঙে যে কয় পয়সা পাওয়া যায়, তা অন্য জায়গায় বিনিয়োগ করলে লাভ হবে। আরেকটি লঞ্চের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লঞ্চ কাটা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। যেসব লঞ্চের মেয়াদ শেষ সেগুলোও কেটে ফেলা হয়। আবার অনেক লঞ্চ শুধু মৌসুমের সময় চালানো হয়। বছরে তিন মাসের বেশি চলে না। এখন লোহার দাম বেশি থাকায় মালিকরা লঞ্চ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন।