প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগণের বিশ্বাস। তাই দেশ ও জনগণের কল্যাণে নির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে কাজ করুন।
তিনি বলেন, সরকার এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে জনমনে ধীরে ধীরে বিশ্বাস গড়ে উঠে। এই ব্যাপারেও আপনারা যত্নবান থাকবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
বুধবার (৬ মে) রাতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের যেকোনো আইনগত ও মানবিক উদ্যোগে সরকার সহায়তা দেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসন শুধু আইন প্রয়োগের যন্ত্র নয়, এটি মানুষের সেবার একটি মাধ্যম। আমি একটি বিষয় গভীরভাবে বিশ্বাস করি- আমাদের সমস্যা অসংখ্য, তবে সম্ভাবনাও কম নয়। আমাদের দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড যেটি আছে, এর সুযোগ নিয়ে আমরা যদি তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যা জনসম্পদে পরিণত হবে। বিশ্বাস রাখুন, এরাই বদলে দিতে পারবে আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশকে।
জনপ্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের প্রশাসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আসুন যথাসম্ভব মানুষের উপকার করার মানসিকতা নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাই। রাষ্ট্র ও সমাজের ধর্মীয় সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে জাগিয়ে রাখতে আমাদেরকে সম্ভাব্য সব উপায় বের করা প্রয়োজন। আমাদেরকে পারিবারিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমরা যদি সবাই একটা ছোট্ট বিষয় মনে রাখি, সেটি হলো- একটি রাষ্ট্রের খুবই ক্ষুদ্র ইউনিট একটি পরিবার। একইভাবে অনেকগুলো, লক্ষ-কোটি পরিবারের সম্মেলনই হলো আমাদের এই রাষ্ট্র। সুতরাং পরিবারগুলো ধর্মীয় সামাজিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত থাকলে রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ সুসংহত হয়।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনে কেন্দ্রে ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এই বার্ষিক সম্মেলন হয়। এতে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের পরিবারও অংশ নেয়।
গত ৩ মে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬ এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্মেলনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা জেলা প্রশাসকদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন এবং জেলা প্রশাসকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
এ ছাড়া ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনাররা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সমাপনীতে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পুনর্মিলনীর এই অনুষ্ঠান হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, মন্ত্রিসভার সদস্য ও তিন বাহিনী প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হয়। বক্তব্যের পর মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৈশভোজে অংশ নেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের চার দিনের সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে আপনারা প্রায় প্রত্যেকেই আগামীকাল যার যার কর্মস্থলে ফিরে যাবেন এবং যথারীতি কাজ শুরু করবেন। এই চার দিনের সম্মেলনে আপনারা একদিকে প্রশাসনিক বিষয়গুলো সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য পেয়েছেন। অপরদিকে বর্তমান সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং কর্মসূচিগুলো সম্পর্কে হাতে-কলমে অবগত হয়েছেন।
তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে আমরা দলীয়ভাবে যেসব ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলাম, সেই ইশতেহারে দেশের জনগণ সমর্থন জানিয়েছেন। সুতরাং এটি এখন আর বিএনপির দলীয় ইশতেহার নয়, বরং এটি এখন দেশের জনগণের ইশতেহার। এটি এখন জনগণের জন্য সরকারের ইশতেহার।
ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন ইশতেহার বাস্তবায়নের পালা। জনস্বার্থে নেওয়া সরকারের কাজগুলো বাস্তবায়নের প্রধান দায়িত্ব জনপ্রশাসনের ওপর বর্তায়। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনের সাফল্য শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য হয়ে দাঁড়ায়। আমি বলি, জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাগণ বিশেষ করে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকগণ হচ্ছেন মাঠ পর্যায়ে সরকারের প্রশাসনিক অ্যাম্বাসেডর।
বর্তমান সরকারের ওপর জনগণের প্রত্যাশা অনেক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের সব যৌক্তিক প্রত্যাশা সাধ্যমত পূরণ করতে বদ্ধপরিকর। এটি জনগণের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। আমরা কথায় কথায় বলি, জনগণ রাষ্ট্রের মালিক। জনগণ যদি সত্যিই রাষ্ট্রের মালিক হয়, তাহলে এই মালিকরা যখন অফিস আদালতে তাদের সমস্যা নিয়ে যান, তারা যেন আপনাদের সেবায় কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের মালিকানা অনুভব করতে পারেন। সেটি নিশ্চিত করা আপনাদের দায়িত্বের অংশ বলে আমি মনে করি।
তারেক রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার করলে তা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে বৃদ্ধি করে। আর যদি হয়রানির শিকার হন, তাহলে তিনি শুধু একটি সেবা থেকেই বঞ্চিত হন না, বরং একইসঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি তার শ্রদ্ধা এবং বিশ্বাস নষ্ট হয়। সুতরাং রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে জনগণের আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে আপনাদের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জনপ্রশাসনকে জনমুখী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে সরকার প্রধান বলেন, প্রশাসনকে জনমুখী করে গড়ে তুলতেই হবে আমাদের। সেই কাজটি আপনাদের ভূমিকার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে বলা যায়। আমাদের সরকার এমন একটি জনমুখী সরকার, যেখানে সরকারি দপ্তরে সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া সম্মানের সঙ্গে দ্রুত সেবা পাবেন। এ বিষয়টি আপনারা নিশ্চিত করতে পারেন।
তিনি বলেন, আইন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানবিকতাও আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। একজন বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষ যখন আপনাদের অফিসের সামনে কিংবা সেবার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন তাদের বিষয়গুলো আইনগত উপায়ে সমাধানের পাশাপাশি তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করাও খুব জরুরি। সেবাগ্রহীতার প্রতি আপনাদের আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা তাদের কাছে রাষ্ট্র ও সরকারের ব্যবস্থা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা জন্ম দেয়। হয়তো এই বিষয়গুলো আমাদের অনেকের কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু জনমনের প্রভাব অনেক বেশি। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ের প্রতি আরো মনোযোগী এবং যত্নবান থাকার জন্য আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এর আগে, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে সচিবালয়ের অফিস থেকে আগারগাঁও শেরে বাংলা নগরে ‘বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে’ বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অনুষ্ঠানে গিয়ে যোগ দেন। এ সময় গাড়িতে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিহউল্লাহ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার প্রমুখ বক্তব্য দেন।





