আসন্ন বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অনেক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, এ নিয়ে ইদানীং বেশ আলোচনা চলছে। স্বাভাবিকভাবেই মাঠের তাপমাত্রা কৌশলগত পরিকল্পনা এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব ফেলবে। তবে আবহাওয়ার প্রভাব কেবল ম্যাচের দিনের পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আর্সেন ভেঙ্গার কিংবা ফাবিও কাপেলোর মতো ফুটবলের শীর্ষস্থানীয় বোদ্ধারা মনে করেন, একটি দেশের জলবায়ু সরাসরি তাদের খেলার ধরনকে প্রভাবিত করে এবং সেই অনুযায়ী খেলোয়াড়দের তৈরি করে। ফলে আবহাওয়া দুই স্তরে ফুটবলকে রূপ দেয়; প্রথমত তাৎক্ষণিকভাবে, ম্যাচের সময় দলগুলোর কৌশল বদলে দিয়ে; দ্বিতীয়ত দীর্ঘমেয়াদে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও বেড়ে ওঠাকে প্রভাবিত করে।
চ্যাম্পিয়ন্স লীগের পাঁচ মৌসুমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রা এবং বাতাসের আর্দ্রতা খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা বেশি থাকলে কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে শট নেওয়ার প্রবণতা কমে যায়, ড্রিবলিং সফল হয় কম এবং দূরপাল্লার শটের সংখ্যা বাড়ে। চলতি মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে রক্ষণভাগ ভাঙার জন্য গতিময় ও ওয়ান-টু-ওয়ান ড্রিবলিংয়ে দক্ষ উইঙ্গারদের ব্যবহার বেড়েছে।
টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দলেও মার্কাস র্যাশফোর্ড, অ্যান্থনি গর্ডন বা বুকায়ো সাকার মতো খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি এই কৌশলেরই অংশ। কিন্তু তীব্র গরমে এই গতি ধরে রাখা এবং আক্রমণাত্মক প্রেসিং বজায় রাখা বেশ কঠিন। একই কথা খাটে ডিফেন্সের গভীর থেকে আক্রমণে উঠে আসা ফুল-ব্যাকদের ক্ষেত্রেও। অতিরিক্ত গরমে খেলোয়াড়রা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ায় আক্রমণভাগের ধার কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দলগুলোকে হয়তো বল পজেশন ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
গত বছরের ক্লাব বিশ্বকাপে প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে পিএসজিকে হারিয়ে চেলসি যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তখন তাদের কোচ এনজো মারেস্কা ম্যাচের শুরুতে চরম আক্রমণাত্মক ‘ম্যান-টু-ম্যান’ প্রেসিং কৌশল বেছে নিয়েছিলেন। ম্যাচের শুরুতে সেই তীব্রতা কাজে লাগিয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে গেলেও আবহাওয়ার কারণে পরে খেলোয়াড়দের ধরে ধরে পরিবর্তন করতে হয়েছিল। ইংল্যান্ড দলের জন্যও এই গরমের মধ্যে র্যাশফোর্ড বা গর্ডনের মতো একই ধরনের বিকল্প খেলোয়াড় থাকাটা বড় সুবিধা দেবে, যা দলের ভারসাম্য না হারিয়েই মূল খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ করে দেবে।
ম্যাচের তাৎক্ষণিক প্রভাবের বাইরে জলবায়ু কীভাবে একটি দেশের ফুটবল দর্শন গড়ে তোলে, তা নিয়ে ইতালির সাবেক কোচ ফাবিও কাপেলো একবার বলেছিলেন যে, যুক্তরাজ্যে বাতাস, বৃষ্টি আর ঠান্ডার মধ্যে খেলোয়াড়দের শান্তভাবে টেকনিক শেখানো অসম্ভব। আর এ কারণেই ব্রাজিল বা দক্ষিণ ইতালির মতো উষ্ণ অঞ্চলের খেলোয়াড়রা বেশি টেকনিক্যাল হয়ে থাকেন। প্রায় দুই দশক আগে ইতালির চেয়ে ইংল্যান্ডে বাতাসের গতি গড়ে ৫০ শতাংশ বেশি ছিল, যা অজান্তেই সেখানকার ফুটবলারদের শিক্ষার ধরন বদলে দিয়েছে। লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও ইংল্যান্ডের ফুটবলকে জার্মানির চেয়ে আলাদা এবং তীব্র বাতাস ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক বেশি ‘ডুয়াল’ (শারীরিক শক্তির) লড়াইনির্ভর বলে উল্লেখ করেছিলেন।
আর্সেনালের কিংবদন্তি কোচ আর্সেন ভেঙ্গারও মনে করতেন, তীব্র বাতাস আর ঠান্ডার কারণে ইংল্যান্ডে অনুশীলনের সময় খেলোয়াড়দের শান্ত রেখে টেকনিক বা ট্যাকটিকস শেখানো যায় না। খেলোয়াড়দের শরীর গরম রাখতে অনবরত দৌড়ের ওপর রাখতে হয়, যা শৈশব থেকেই তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। অবশ্য পেপ গার্দিওলা, ইয়ুর্গেন ক্লপ বা আন্তোনিও কন্তের মতো আধুনিক কোচদের হাত ধরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইংল্যান্ডের ফুটবল কৌশলে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান কোচ টমাস টুখেল আশা করবেন যে, প্রিমিয়ার লীগের এই আধুনিক শিক্ষা ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মঞ্চে যেকোনো ঘাটতি পুষিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে শৈশব থেকে ঠান্ডা, বাতাস আর বৃষ্টিতে অভ্যস্ত ইংলিশ ফুটবলারদের যদি এবার বিশ্বমঞ্চে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হয়, তবে তা করতে হবে সম্পূর্ণ এক অপরিচিত ও প্রতিকূল উষ্ণ জলবায়ুর মুখোমুখি হয়েই।
সূত্র: বিবিসি





