বিশ্বকাপ ফুটবলের একটি স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর চরম বিরোধীতার মুখে রয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। উয়েফা থেকে শুরু করে অনেকে সংস্থাটির কার্যক্রমের প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি ইনফান্তিনোকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বলেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ফিফার অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে ছোট ফুটবল ফেডারেশনগুলোর নীরব থাকার বিষয়ে কথা বলেছেন পাপুয়া নিউগিনির সাবেক ফুটবলার অ্যালেক্স দাভানি। তিনি মনে করেন, ছোট ক্লাবগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়ন হারানোর ভয়ে নিরব রয়েছে।
ফুটবল অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি দাভানি মনে করেন, বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নমূলক অর্থায়ন ব্যবস্থায় ত্রুটি রয়েছে। তিনি আশা করছেন, জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পরিত্যক্ত ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা হয়তো সংস্কারের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
বৈশ্বিক ফুটবলকে বিভক্ত করে ফেলা এই বিবাদ নিয়ে আলোচনার জন্য ওশেনিয়া অঞ্চলের ১১টি সদস্য ফেডারেশনের বুধবার বৈঠক করার কথা ছিল। দাভানির মতে, তারা বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। ব্রিসবেন থেকে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইনজীবী ও ক্রীড়া প্রশাসক দাভানি বলেন, এই অঞ্চল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা বা নিশ্চুপ ভাব দেখা যাচ্ছে, তাকে আমি কোনোভাবেই কোনো কিছুর সঙ্গে সায় দেওয়া বা উদাসীনতা বলে মনে করি না।
তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় এমন পরিস্থিতিতে এটি একটি প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। কারণ, ওশেনিয়ার কোনো সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ফিফার উন্নয়নমূলক অর্থায়নই অনেক সময় তাদের পুরো কার্যক্রম পরিচালনার বাজেট হিসেবে কাজ করে। সেই প্রেক্ষাপটে, আমার মনে হয় তারা বেশ জটিল এক পরিস্থিতিতে পড়েছে।
ফুটবল অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি বলেন, একদিকে যেমন বড় বড় কনফেডারেশনগুলো এই প্রস্তাবের বিষয়ে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বিষয়টি সঠিক না ভুল বা ইচ্ছাকৃত কি না তা বড় কথা নয়। তবে মতামত প্রকাশ করলে বা কোনো অবস্থান নিলে সেই অর্থায়ন হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আপনি নিশ্চয়ই সেই অর্থায়ন ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাইবেন না, কারণ এটিই আপনার জীবিকা।
দাভানির মতে, এই ব্যবস্থার মূল ত্রুটি হলো ফিফার অর্থায়ন কোনো নিশ্চিত অধিকার বা পাওনা নয়, বরং এটি তাদের ইচ্ছাধীন বা বিবেচনামূলক বিষয়। তিনি বলেন, ফিফার সংবিধানে উন্নয়নমূলক অর্থায়ন ও উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে প্রায়শই কথা বলা হলেও, কোথাও এমন কোনো নীতি বা বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা নেই। এই উন্নয়নমূলক অর্থ কোনো নিশ্চিত পাওনা নাকি কর্তৃপক্ষের ইচ্ছাধীন অর্থ।
সাবেক এই ফুটবলঅর আরও বলেন, আমরা সবাই বিশ্বাস করি পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ আমাদেরই সম্পদ এবং এই বড় আয়োজনগুলো থেকেই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আসে। তাই আমার মনে হয়, যদি আমরা এই সম্পদের মালিকানার বিষয়টি অনুভব করি। তবে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এই অর্থ কোথায় ব্যয় করা উচিত।
দাভানি উল্লেখ করেন, ওশেনিয়া অঞ্চলের অধিকাংশ ছোট ফেডারেশন ফিফায় ইনফান্তিনোর এক দশকের নেতৃত্বে বেশ উপকৃত হয়েছে। যেখানে চার বছরের চক্রে অর্থায়নের পরিমাণ ২০-৩০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে সর্বশেষ ধাপে ৮০ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
২০২৩ সালে ইনফান্তিনো ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ তহবিলের অর্থায়নে পাপুয়া নিউগিনিতে(পিএনজি) একটি নতুন জাতীয় ফুটবল কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন এবং সলোমন দ্বীপপুঞ্জেও আরেকটি কেন্দ্র চালু হয়েছে। এছাড়া ভানুয়াতুতে একটি নতুন স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে। ইনফান্তিনোর বিতর্কিত পরিকল্পনায় যদি ২১১টি পূর্ণ সদস্য অ্যাসোসিয়েশন সম্মতি দিত, তবে তিনি ৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা হয়তো বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারত।
কিন্তু দাভানির মতে, ওশেনিয়ার ঠিক কেমন ফিফা সভাপতি প্রয়োজন, সেই মূল বিষয়টি এতে আড়ালে পড়ে যেত। তিনি বলেন, ওশেনিয়ার মতো একটি অঞ্চলের জন্য আমাদের এমন নেতাদের প্রয়োজন যাদের পেশাদার ফুটবলের বিকাশ ও উন্নয়নের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রকৃত বোঝাপড়া রয়েছে।
সামোয়ার হয়ে খেলার পর অস্ট্রেলিয়ার দলে যোগ দেওয়া টিম কাহিল এবং নিউ ক্যালেডোনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী ক্রিশ্চিয়ান কারেম্বুর কথা উল্লেখ করে দাভানি বলেন, সঠিক পরিচর্যা পেলে ওশেনিয়াতেও প্রচুর প্রতিভার বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ফিফার মধ্যকার এই বিভেদ বা মতপার্থক্যের বিষয়ে আমার কাছে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো আমরা ফুটবল নিয়ে আলোচনা করা বন্ধ করে দিয়েছি। বিশেষ করে এমন একটি অঞ্চলে যেখানে ফুটবল আরও বেশি খেলা হওয়া প্রয়োজন। আমার মনে হয় না, প্রতিভার কোনো অভাব ছিল। সমস্যাটা আসলে সেই প্রতিভাকে ঘিরে থাকা কাঠামোগত ব্যবস্থায়। আর ঠিক এ কারণেই আমি চাই আমরা আবারও ফুটবলের আলোচনায় ফিরে আসি।





