সম্মিলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে ৫৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের শেয়ারবাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। গত ৮ মাস ব্যাংকগুলোর শেয়ার লেনদেন বন্ধ থাকায় আটকে গেছে বিশাল এ লগ্নি। এখন লভ্যাংশ দূরে থাক, মূলধন নিয়েই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। দীর্ঘদিন লেনদেন বন্ধ থাকায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর আর্থিক চাপ। বিক্ষোভ আর ব্যাংকে তালা লাগিয়ে গ্রাহক আন্দোলন নজর কাড়লেও, শেয়ার বাজারের এ বিনিয়োগকারীরা থেকে গেছেন চোখের আড়ালে।
আমানত উত্তোলন ও হেয়ার কাট বাতিলসহ নানা দাবিতে সম্মিলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে দীর্ঘদিন। ব্যাংকে তালা দেয়াসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আলোচনায় আসেন তারা।
অথচ শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোতে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূলধন বিনিয়োগ করে সারা দেশের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিপাকে পড়লেও থেকে গেছেন আড়ালে। ব্যাংক খাতে বিশাল এ লগ্নি করে প্রতিনিয়ত বাড়ছে তাদের শঙ্কা আর উদ্বেগ। বিশেষ করে গত ৮ মাস এসব ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত থাকায় চিন্তার ভাঁজ সবার কপালে।
প্রায় ৩০ বছর শেয়ার বাজারের সঙ্গে আছেন মোহাম্মদ কায়সার চৌধুরী। তিনি শেয়ার কিনেছেন বিভিন্ন ব্যাংকের। বিনিয়োগের আগে নিট অ্যাসেট ভ্যালু, আর্নিং পার শেয়ার ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ করেন এক্সিম ব্যাংকে। কিন্তু গেলো ডিসেম্বর শেয়ার লেনদেন স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েন এই বিনিয়োগকারী।
মোহাম্মদ কায়সার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সাধারণ বিনিয়োগকারী যারা আছি, আমাদের এই টাকাগুলোর কী হবে? আমাদেরকে দেখার জন্য তো সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আছে। এরা কোনো আমাদের পক্ষে কাজ করতেছে না।’
তার মতো আরও লাখ লাখ বিনিয়োগকারী সম্মিলিত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন। তাদের কেউ কেউ জীবনের শেষ সঞ্চয়ও বিনিয়োগ করেন শেয়ার লেনদেনে। এখন লভ্যাংশ বা আয় উপার্জন করতে না পেরে পড়েছেন আর্থিক সংকটে।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা ন্যাভ দেখছি, ইপিএস দেখছি। তারপর আমরা নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো-টা দেখছি। বুঝেশুনেই তো বিনিয়োগ করছি।’
অন্য একজন বলেন, ‘টোটালে কথা নাই বার্তা নাই শেয়ারগুলো… কোম্পানি বন্ধ করে দিছে, ব্যাংক বন্ধ করে দিছে। আমরা বিনিয়োগকারী যারা আছি, আমরা মাঠে-ময়দানে এখন বইসা বইসা কানতেছি।’
বিনিয়োগকারী একজন বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কি বুঝে হঠাৎ করি একটা ডিসিশন নিলো সম্মিলিত পাঁচটা ব্যাংকে টোটালি ডিলিট করি লইলো ইয়ে থেকে, শেয়ার মার্কেট থেকে। এতে করি এখন আমি আমার শেয়ারটা বিক্রিও করতে পারতেছি না, আমার টাকাটা শূন্য হয়া গেছে গা।’
ব্যাংকের আমানতকারীদের বিষয়ে নির্দেশনা থাকলেও, যারা ওইসব ব্যাংকে শেয়ার কিনেছেন- তাদের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি সরকার। লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর কথা কেউ ভাবছে না বলে অভিযোগ ইনভেস্টর ফোরাম নেতাদের।
চট্টগ্রাম ইনভেস্টর ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ কাদের বলেন, ‘ব্যাংকে এফডিআর না করে আমি শেয়ারে এফডিআর করলাম। ইয়ারলি একটা ভালো ডিভিডেন্ড পায়। এই প্রত্যাশা নিয়ে সবাই কিন্তু এই ব্যাংকগুলাতে শেয়ার বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু আপনে কেন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বুঝা দরকার ছিল যে এই যে বিনিয়োগকারীরা একটা বিপদে পড়ে যাবে, তাহলে তার অবস্থাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তার দায়িত্ব নিবে কে?’
সরকারের এমন পদক্ষেপে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তাই মানবিক দিক বিবেচনায় দ্রুত বিনিয়োগকারীদের ব্যাপারে নির্দেশনা চায় চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জ।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক এমদাদুল হক বলেন, ‘যার যেটা তারা শেয়ার হোল্ড করছে, তাদের কাছে ডকুমেন্ট আছে। সেই অনুযায়ী তাদের জন্য একটা ওয়ে, তাদেরকে সেখানে বাঁচার পথ করে দিতে হবে। নাইলে এই মানুষগুলোকে মানবিক দিক থেকেও তাকে যেন বিধ্বস্ত করা হবে, অন্য দিকে আর্থিকভাবেও তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে।’
পাঁচটি ব্যাংকের প্রায় ৫৮ হাজার ১৯৫ কোটির বেশি শেয়ারবাজারে ছাড়া হয়। যা কিনেছেন এসব ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।





