সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা ১ কোটিতে সীমিত রাখার প্রস্তাব নিয়ে গণভোট আজ

অভিবাসন কি সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ, নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ওপর একটি বাড়তি চাপ? এই জটিল ও স্পর্শকাতর প্রশ্নের মীমাংসা করতে রোববার (১৪ জুন) ঐতিহাসিক এক গণভোটে অংশ নিচ্ছেন সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরা। দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেওয়া এই গণভোটের মূল প্রস্তাব হলো-আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে কোনোভাবেই দেশের জনসংখ্যা ১ কোটি অতিক্রম করতে দেওয়া যাবে না।

ডানপন্থী সুইস পিপলস পার্টি প্রস্তাবটির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। দলটির দাবি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আবাসন, সরকারি চাকরি ও পরিবেশের ওপর চাপ কমবে। তারা এটিকে ‘টেকসই উদ্যোগ’ হিসেবে তুলে ধরছে।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার, অন্যান্য রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো প্রস্তাবটির বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, এটি কার্যকর হলে হাসপাতাল, হোটেলসহ বিভিন্ন খাতে কর্মীসংকট দেখা দেবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২০০২ সালে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ। বর্তমানে তা বেড়ে ৯১ লাখে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ বিদেশে জন্মগ্রহণকারী। অনেক নাগরিক ট্রেনে ভিড়, উচ্চ ভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সুইজারল্যান্ডে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র পদ্ধতিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোট হয়। এ ধরনের ভোট আয়োজনের জন্য এক লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহই যথেষ্ট।

সাম্প্রতিক জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবের বিপক্ষে এবং ৪৫ শতাংশ পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। বাকিরা এখনো সিদ্ধান্তহীন।

বার্ন ক্যান্টন পার্লামেন্টে সুইস পিপলস পার্টির প্রতিনিধি নিলস ফিয়েখতার বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের কারণে আমরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি।’ তার মতে, আবাসনসংকট, যানজট ও সামাজিক সেবার ওপর চাপ বৃদ্ধির পেছনে অভিবাসন দায়ী।
অন্যদিকে বার্ন সিটি কাউন্সিলে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সদস্য হেলিন জেনিস বলেন, অভিবাসীদের সমস্যার জন্য দায়ী করা সমাধান নয়। তার ভাষ্য, বাসাভাড়া, স্বাস্থ্যবিমা বা অবকাঠামো বিনিয়োগের মতো সিদ্ধান্ত অভিবাসীরা নেন না।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের আগে কোনো অবস্থাতেই জনসংখ্যা এক কোটির বেশি হতে পারবে না। জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছালে সরকারকে তা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমানো ও বিদেশি কর্মীদের পরিবার আনার অধিকার সীমিত করার বিষয় থাকতে পারে।

যদি জনসংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছে যায়, তবে সুইজারল্যান্ডকে ইইউ নাগরিকদের অবাধ চলাচলসহ কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল করতে হতে পারে। ব্যবসায়ী সংগঠন ‘ইকোনমিসুইস’ সতর্ক করেছে, এতে ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়বে। সংগঠনটির প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ বলেন, ‘ইইউ আমাদের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের স্বার্থে।’

নিয়োগকর্তারা আশঙ্কা করছেন, দক্ষ বিদেশি কর্মী হারালে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের হোটেল খাতে কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই অভিবাসী। হাসপাতাল ও কেয়ার হোমগুলোও বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল।
বিরোধীরা আরও উল্লেখ করছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সেবা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় তরুণ কর্মী প্রয়োজন, যা কেবল অভ্যন্তরীণভাবে পূরণ করা কঠিন।

বিশ্বের কোনো দেশই এখন পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার ওপর নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সীমা আরোপ করেনি। যদিও চীন একসময় ‘এক সন্তান নীতি’ চালু করেছিল, সেটি বর্তমানে বাতিল। সুইজারল্যান্ডের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে।