ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই দুই দলের ফুটবলারদের মুখে ছিল দুই রকমের অনুভূতি। পর্তুগালের খেলোয়াড়দের চোখেমুখে হতাশা, আর ডিআর কঙ্গোর ফুটবলারদের উদযাপনে যেন জয়ের আনন্দ। স্কোরলাইন বলছে ১-১, কিন্তু হিউস্টনের রাতে পাওয়া এই এক পয়েন্টের মূল্য দুই দলের কাছে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন!
বিশ্বকাপের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পর্তুগাল। ৪১ বছর বয়সী ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ-এমন আলোচনা, শক্তিশালী স্কোয়াড, আর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স মিলিয়ে দলটিকে নিয়ে ছিল বড় প্রত্যাশা। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো এসেছিল অনেকটা নীরবে। ১৯৭৪ সালের পর বিশ্বকাপে ফেরার গল্পটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু দেখিয়ে দিল আফ্রিকার দলটি!
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য পর্তুগালের পরিকল্পনামাফিকই হয়েছিল। ছয় মিনিটে জোয়াও নেভেসের হেডে এগিয়ে যায় তারা। তরুণ মিডফিল্ডারের জন্য এটি ছিল স্বপ্নের মতো এক মুহূর্ত। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ, আর সেই ম্যাচেই গোল। গোল পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল পর্তুগাল হয়তো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেবে। বলের দখলও ছিল তাদের পায়ে।
কিন্তু ফুটবল সব সময় পরিসংখ্যানের গল্প নয়। ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই আত্মবিশ্বাসী হয়েছে কঙ্গো। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু রক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য মাঠে নামেনি। মাঝমাঠে লড়াই, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং শারীরিক শক্তির দিক থেকে তারা পর্তুগালকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে শুরু করে।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ডান দিক থেকে আসা এক ক্রসে হেড ছুঁইয়ে বল জালে পাঠান ইয়োআনে উইসা। গোলটি শুধু ম্যাচে সমতা ফেরায়নি, বিশ্বকাপ ইতিহাসে ডিআর কঙ্গোর প্রথম গোল হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। ৫২ বছর আগে জায়ার নামে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলটি একটিও গোল করতে পারেনি। তাই উইসার গোলটি কেবল একটি গোল নয়, এটি ছিল কয়েক দশকের অপেক্ষার অবসান।
বিরতির পর প্রত্যাশা ছিল পর্তুগাল আরও আক্রমণাত্মক হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। বলের নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছেই ছিল, তবে আক্রমণে ছিল না ধার। রোনালদোকে ঘিরে কঙ্গোর রক্ষণভাগের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট। তাকে খুব কম জায়গা দেওয়া হয়েছে, আর সেই চাপ থেকে বের হয়ে ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারেননি পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।
দ্বিতীয়ার্ধে জোয়াও ক্যানসেলো বল জালে জড়িয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু অফসাইডের পতাকা ওঠায় সেই আনন্দ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায়। এরপর পর্তুগালের আক্রমণে সৃজনশীলতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুযোগ তৈরি করতে হিমশিম খেতে থাকে ইউরোপের দলটি।
বরং ম্যাচের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে কঙ্গোর সামনে। ৭৭ মিনিটে দুর্দান্ত এক দলীয় আক্রমণের পর সেদ্রিক বাকাম্বু একেবারে গোলরক্ষকের মুখোমুখি হয়ে যান। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে হয়তো বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের সাক্ষী হতো ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু তার শট উড়ে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল হয়নি। তবে ড্রয়ের ফলাফলের মধ্যেও লুকিয়ে আছে দুটি ভিন্ন গল্প। পর্তুগালের জন্য এটি সম্ভাব্য দুই পয়েন্ট হারানোর ম্যাচ। বিশ্বকাপের মতো আসরে গ্রুপপর্বের প্রতিটি পয়েন্ট মূল্যবান, আর তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয় না পাওয়া তাদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে থাকল।
অন্যদিকে ডিআর কঙ্গোর জন্য এটি আত্মবিশ্বাসের নতুন অধ্যায়। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম গোল, প্রথম পয়েন্ট এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুর্দান্ত লড়াই—সব মিলিয়ে হিউস্টনের রাতটি তাদের ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ স্থান পাবে।
রোনালদোকে ঘিরে যত প্রত্যাশাই থাকুক, এই ম্যাচের গল্প শেষ পর্যন্ত তার নয়। গল্পটি ডিআর কঙ্গোর, যারা বিশ্বকাপে ফিরে প্রথম ম্যাচেই প্রমাণ করে দিয়েছে তারা শুধু অংশ নিতে আসেনি, লড়তেও এসেছে!





