কোয়ার্টার ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই কানসাস সিটির উল্লাস যেন আটলান্টার দিকে ছুটে গেল। সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ওঠার পর থেকেই বদলে গেছে বিশ্বকাপের আবহ। মাঠের লড়াই শুরু হতে এখনো কয়েক দিন বাকি, কিন্তু ইংল্যান্ডে যেন ম্যাচটি ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় এখন একটাই নাম-আর্জেন্টিনা। আর সেই নামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি!
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি হবে আর্জেন্টিনা জার্সিতে মেসির প্রথম ম্যাচ। দুই দশকেরও বেশি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, ছয়টি বিশ্বকাপ আর দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেও এই এক অধ্যায় এত দিন লেখা হয়নি। সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চগুলোর একটিতে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম অবশ্য কেবল বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত নয়। তারা বারবার ফিরে যাচ্ছে ইতিহাসে। ১৯৬৬, ১৯৮৬, ১৯৯৮ ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের প্রতিটি স্মরণীয় অধ্যায় যেন আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ান ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের সেই বহুল আলোচিত কোয়ার্টার ফাইনালকে সামনে এনে লিখেছে, ‘হ্যান্ড অব গড’ যে ক্ষোভ ও আলোড়নের জন্ম দিয়েছিল, চার দশক পরও তার রেশ পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। এবার সেই ইতিহাসের সঙ্গে যোগ হচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়-প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নামবেন লিওনেল মেসি।
দ্য সানের ভাষা আরও আক্রমণাত্মক। তাদের মতে, বিশ্বকাপ জিততে হলে ইংল্যান্ডকে আগে ‘লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে সিংহাসনচ্যুত’ করতে হবে। একই প্রতিবেদনে তারা এই লড়াইকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈরিতাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে এখানেই থামেনি পত্রিকাটি। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের রেফারিং নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। ম্যাচ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, স্কালোনির দল যেন ‘১২ জন খেলোয়াড়’ নিয়ে খেলেছে, কারণ রেফারি জোয়াও পিনেইরো নাকি বিভিন্ন সিদ্ধান্তে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সুবিধা দিয়েছেন।
ডেইলি মেইল অবশ্য অন্য গল্প বলছে। তাদের চোখে এটি ‘একটি ঐতিহাসিক রাত’। কারণ ৩৯ বছর বয়সী মেসি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিয়েছে আজতেকা স্টেডিয়ামে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্সের কথা। পত্রিকাটির মতে, মেক্সিকোর বিপক্ষে জয়ের মাধ্যমে ইংল্যান্ড অতীতের কিছু দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু এবার তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আর্জেন্টিনার আরেক জাদুকর। সেই সঙ্গে প্রশ্নও ছুড়ে দিয়েছে-টানা ম্যাচের ধকলের পর মেসির শরীর আর কতটা চাপ নিতে পারবে?
ইনডিপেনডেন্টের দৃষ্টিতে আর্জেন্টিনা সহজ কোনো পথ পেরিয়ে আসেনি। তাদের মতে, কানসাস সিটিতে দলের পারফরম্যান্স খুব উজ্জ্বল ছিল না। তবে হুলিয়ান আলভারেজের দুর্দান্ত গোল এবং শেষ পর্যন্ত জয় সেই সব প্রশ্নকে আড়াল করে দিয়েছে। এখন আর্জেন্টিনার সব মনোযোগ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অপেক্ষমাণ আরেকটি বড় লড়াইয়ে।
দ্য টেলিগ্রাফও যেন এই মুহূর্তটির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিল। ‘ইংল্যান্ডের পথের কাঁটা লিওনেল মেসি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারা লিখেছে, অবশেষে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সেই সঙ্গে তাদের মন্তব্য, এই ম্যাচ পুরোনো সব শত্রুতাকে আবারও নতুন করে জাগিয়ে তুলবে!
আসলে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মানেই শুধু দুটি ফুটবল দলের লড়াই নয়। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, শতাব্দীর সেরা গোল, ১৯৯৮ সালের লাল কার্ড বিতর্ক, এমনকি মাঠের বাইরের ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতিও। তাই এই ম্যাচ যতটা ফুটবল, ততটাই ইতিহাস।
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে যখন দুই দল মুখোমুখি হবে, তখন শুধু ফাইনালে ওঠার টিকিটই ঝুলবে না। সঙ্গে থাকবে চার দশকের স্মৃতি, অসমাপ্ত বিতর্ক, প্রতিশোধের গল্প আর নতুন কিংবদন্তি জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল এমনিতেই বিশেষ। কিন্তু ইংল্যান্ড আর আর্জেন্টিনা যখন একই মাঠে নামে, তখন সেটি আর শুধু একটি ম্যাচ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে এমন এক গল্প, যার পরের অধ্যায়ের অপেক্ষায় থাকে পুরো ফুটবল বিশ্ব!





