নিউ জার্সির ফাইনাল শেষ হওয়ার পর ক্যামেরা বারবার ঘুরে যাচ্ছিল লিওনেল মেসির দিকে। বিশ্বকাপে ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট, ফাইনালে ওঠার পথে একের পর এক ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে টেনে তোলা-সব মিলিয়ে অনেকের ধারণা ছিল, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ হয়তো উঠবে তার হাতেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্মান গেল স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির হাতে। আর মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ের সম্ভাব্য শেষ দৃশ্য হয়ে রইল চোখের জল!
৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এই বিশ্বকাপ ছিল আবেগ আর প্রত্যাশার এক অনন্য মিশেল। কাতারে শিরোপা জয়ের চার বছর পর তিনি আবারও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, বিদায়বেলায় হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফিটাও তার হাতেই উঠবে। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে সেই স্বপ্ন থেমে যায়।
পুরো টুর্নামেন্টে মেসির অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ৮ গোলের পাশাপাশি করেছেন ৪টি অ্যাসিস্ট। নকআউট পর্বে একাধিক ম্যাচে তাঁর নেতৃত্বই আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়েছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তে তার দুটি নিখুঁত অ্যাসিস্ট থেকে আসে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়া দুই গোল। কঠিন মুহূর্তে দলের ভরসা হয়ে ওঠাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবু ব্যক্তিগত পুরস্কারের লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসেন রদ্রি। ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডারের গোল বা অ্যাসিস্টের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো না হলেও স্পেনের খেলার ছন্দের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনিই। বল দখল, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ ও রক্ষণকে একই সুতোয় গেঁথে রাখার দায়িত্ব অসাধারণভাবে পালন করেছেন তিনি।
পরিসংখ্যানও রদ্রির পক্ষেই কথা বলছে। পুরো বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ৭৫৩টি সফল পাস করেছেন স্প্যানিশ অধিনায়ক, যার সফলতার হার ছিল ৯৪ শতাংশ। টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি ১,৮০৩টি প্লেতে অংশ নিয়েছেন, যা অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু ফাইনালেই ১০৫টি পাসের মধ্যে ১০১টি সফলভাবে সম্পন্ন করেন তিনি, জেতেন ৮০ শতাংশ ডুয়েল এবং তৈরি করেন দুটি পরিষ্কার গোলের সুযোগ। তার নেতৃত্বেই স্পেন আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ে।
পুরস্কার হাতে নিয়ে রদ্রি নিজের প্রত্যাবর্তনের গল্পও তুলে ধরেন। হাঁটুর অস্ত্রোপচারের কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকার পর বিশ্বকাপে ফিরে দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি।
এমন অর্জনের পর রদ্রি বলেন, ‘আমার জন্য সময়টা খুব কঠিন ছিল। আমি শুধু নতুন প্রজন্মকে দেখাতে চাই যে, আপনি যদি পড়েও যান, তবে আবারও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। এটাই আমার জীবনের দর্শন। সব সময় সবকিছু ভালো যাবে না, কখনও খারাপও হবে। তবে সব সময় ইতিবাচক থাকতে হবে।’
অন্যদিকে গোলের রেকর্ডের লড়াইটাও শেষ পর্যন্ত মেসির নাগালের বাইরে চলে যায়। টুর্নামেন্টে ২১ বিশ্বকাপ গোল নিয়ে এগিয়ে থাকলেও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে ২২ গোল নিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতার আসন দখল করেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে। ফলে গোল্ডেন বুটের দৌড়েও পিছিয়ে পড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
শেষ পর্যন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন দুই ভিন্ন গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকল। একদিকে ছিল মেসির আবেগঘন বিদায়ের সম্ভাব্য শেষ অধ্যায়, অন্যদিকে ছিল রদ্রির অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন আর স্পেনের নতুন ফুটবল সাম্রাজ্যের উত্থান। ব্যক্তিগত পুরস্কারটি রদ্রির হাতে উঠলেও, বিশ্বকাপজুড়ে মেসির প্রভাব ও নেতৃত্ব ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেবে!





