কানাডায় অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি-ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ৯৬৮ বাংলাদেশি

অবৈধভাবে বসবাস কিংবা বিভিন্ন কারণে কানাডায় থাকার বৈধতা হারানো বিদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সরকার। সেই তালিকায় শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে ৯৬৮ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

সিবিএসএর ‘রিমুভালস ইন প্রোগ্রেস’ তালিকার ৩০ জুন পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেরত পাঠানো নিশ্চিত হওয়া বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। তালিকায় ৭ হাজার ৬৬৯ জন নাগরিক নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত। দ্বিতীয় অবস্থানে মেক্সিকো—৬ হাজার ৫৬১ জন। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ১৭৯ জন, চীনের ১ হাজার ৮৯২ জন, নাইজেরিয়ার ১ হাজার ৬৪৭ জন, কলম্বিয়ার ১ হাজার ২৩৭ জন, পাকিস্তানের ১ হাজার ১৩৯ জন, ব্রাজিলের ১ হাজার ১১৮ জন এবং চিলির ১ হাজার ৩০ জন নাগরিক।

সিবিএসএর তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ৩০৮ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এরপর কয়েক বছর সংখ্যা কম থাকলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ২২৭ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ১০ হাজার ৬০৭ জনকে কানাডা থেকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কানাডা সরকার সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থী বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রবণতাও বেড়েছে। কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াধীন ৪০ হাজার ৮২৭ জন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে ৩৬ হাজার ৬২২ জনই রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী।

এদিকে ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার (আইআরসিসি) তথ্য অনুযায়ী, ভিজিটর ভিসায় কানাডায় গিয়ে পরে আশ্রয়ের আবেদন করা ১৭৫ জনের মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন।

কানাডায় বসবাসরত এক বাংলাদেশি গবেষকের মতে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনে নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিপীড়নের আশঙ্কায় করা পুরোনো আবেদনগুলো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে; অন্যদিকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার কারণে দেশে ফেরার ঝুঁকি দেখিয়ে নতুন করে আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের জন্য আশ্রয় পাওয়ার পরিস্থিতি আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর হচ্ছে। অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ, মানব পাচারসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশিদের ভিসা ও অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার ২৪৫টি ছিল প্রথমবারের আবেদন। একই সময়ে ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের প্রথম ধাপে স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়টি অনেক বাংলাদেশির আশ্রয় আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ এখনো ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে আগের মতো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। এরপরও ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে অনেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করে কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করছেন। অনেকের উদ্দেশ্য মূলত স্থায়ীভাবে বিদেশে থাকা। তার মতে, অ্যাসাইলাম আবেদনের সংখ্যা বাড়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য নেতিবাচক বিষয়।