গণভোট: ইইউতে যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান আইসল্যান্ডের

ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর প্রস্তাব গণভোটে প্রত্যাখ্যান করেছে আইসল্যান্ডের জনগণ।

দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরইউভি জানিয়েছে, ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও ‘না’ ভোট স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।

রবিবার অনলাইনে প্রকাশিত ভোটের ফল অনুযায়ী, রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গণনা হওয়া ভোটের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ‘না’ পক্ষে। অন্যদিকে ইইউতে যোগদানের বিষয়ে আলোচনা শুরুর পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

আইসল্যান্ডের ছয়টি ভোটকেন্দ্রিক জেলার মধ্যে একটি জেলায় অল্পসংখ্যক ব্যালট গণনা বাকি থাকলেও ফলাফলের ব্যবধান বিবেচনায় ইইউতে যোগদানের আলোচনা শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে জানিয়েছে আরইউভি।

দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আইসল্যান্ড জাতি ইইউর সঙ্গে যোগদানের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে।”

এখন না হলে আর কখনও নয়—সরকারের অবস্থান
আইসল্যান্ডের সরকার ইইউ সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা শুরুর প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরেছিল। প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্তুন ফ্রস্টাদোত্তির আগস্টে ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হলে ইইউ সদস্যপদ নিয়ে চলমান সব ধরনের আলোচনা কার্যত থেমে যাবে।

সরকারের পরিকল্পনা ছিল, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে ইইউর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ আলোচনা শুরুর বিষয়ে স্পষ্ট অনুমোদন নেওয়া। তবে ভোটের ফল সরকারের সেই উদ্যোগে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইইউপন্থীদের যুক্তি কী ছিল?
ইইউতে যোগদানের পক্ষে প্রচার চালানো গোষ্ঠীগুলো বলেছিল, ইউনিয়নের সদস্য হলে আইসল্যান্ডের অর্থনীতিতে বেশ কিছু সুবিধা আসতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার কমানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তারা দাবি করে।

এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বক্তব্যের মতো ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আইসল্যান্ডের নিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হতে পারে বলেও ‘হ্যাঁ’ পক্ষের প্রচারকারীরা যুক্তি দেন।

বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে থাকায় ইউরোপের সঙ্গে আইসল্যান্ডের সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছিলেন ইইউপন্থীরা।

সার্বভৌমত্ব ও মৎস্যসম্পদ হুমকিতে পড়বে
অন্যদিকে ইইউবিরোধী বা ‘না’ ভোটের পক্ষের প্রচারকারীরা সদস্যপদের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলোর ওপর জোর দেন। তাদের প্রধান যুক্তি ছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হলে আইসল্যান্ডের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এছাড়া দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ মৎস্যসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। ইইউর অভিন্ন নীতিমালা ও বিধিবিধানের কারণে আইসল্যান্ডের নিজস্ব মৎস্যজলসীমা ও মাছ ধরার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে ‘না’ ভোটের পক্ষের প্রচারকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ফলে গণভোটের প্রচারে অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিরাপত্তার প্রশ্নের বিপরীতে সার্বভৌমত্ব এবং মৎস্যসম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বড় হয়ে ওঠে।

২০০৯ সালে প্রথম আবেদন, ২০১৩ সালে আলোচনা স্থগিত
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিষয়ে আইসল্যান্ডের আগ্রহ নতুন নয়। ২০০৯ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়ার পর প্রথমবারের মতো ইইউ সদস্যপদের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিল আইসল্যান্ড।

পরবর্তী সময়ে ইইউর সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে সেই প্রক্রিয়া বেশিদূর এগোয়নি। ২০১৩ সালে একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী সরকার আলোচনাটি বন্ধ করে দেয়।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে ইইউ সদস্যপদ নিয়ে আইসল্যান্ডের রাজনীতিতে বিতর্ক চললেও এবার জনগণের সরাসরি ভোটে সেই আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলো।

সাম্প্রতিক গণভোটের ফলের ফলে আপাতত আইসল্যান্ডের ইইউ সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব, মৎস্যসম্পদ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ইইউর সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা