নবনির্বাচিত কোনো সরকার তার পূর্বসূরি সরকারের করা চুক্তি ও সমঝোতা পর্যালোচনা করবে—এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। সরকার বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়, ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো কোন শর্তে দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে, সেটিও নতুন করে মূল্যায়ন করতে হয়।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সেই পর্যালোচনা নীতিগত মূল্যায়নের বদলে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিচারের উপায় হয়ে ওঠে—কোন চুক্তি কে করেছে, সেটিই যখন চুক্তিটি কী ফল দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। বিষয়টি এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সরকার এসব চুক্তি পর্যালোচনা করছে এবং পর্যালোচনার ফল জানানো হবে।
একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় সরকার। তবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একই ধরনের ভারসাম্যের কথা বলেছেন। ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন।
একই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত পাঠানোর দাবিও অব্যাহত রেখেছে ঢাকা।
এখানে কোনো বিরোধ নেই। একটি সরকার নির্দিষ্ট কিছু চুক্তি পুনর্বিবেচনা বা পুনর্নির্ধারণ করতে পারে, আবার একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সামগ্রিকভাবে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, এই পর্যালোচনা কি নীতিনির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া হবে, নাকি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতির আরেকটি অধ্যায়ে পরিণত হবে।
সব চুক্তি এক রকম নয়:
১০১টি চুক্তি—সংখ্যাটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা খুব বেশি কিছু বলে না।
একটি বাণিজ্য চুক্তি আর বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এক নয়। যোগাযোগসংক্রান্ত ব্যবস্থা আর নিরাপত্তা চুক্তির প্রকৃতিও এক নয়। আবার একটি সমঝোতা স্মারক সব সময় একটি চুক্তির মতো একই ধরনের আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না।
কোনো কোনো চুক্তি সংশোধন করা প্রয়োজন হতে পারে। কোনোটি হয়তো তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে। কোনোটি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। আবার কোনো কোনো চুক্তি মোটামুটি কার্যকরভাবেই চলছে। তাই পর্যালোচনার শুরুটা হওয়া উচিত এই প্রশ্ন দিয়ে নয় যে চুক্তিটি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হয়েছিল কি না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—চুক্তিটি বাংলাদেশের স্বার্থে কতটা কার্যকর। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাসেই এর একাধিক উদাহরণ রয়েছে।
স্থলসীমান্ত চুক্তি:
২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির কথা ধরা যাক। ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং ২০১১ সালের প্রটোকল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধনী ভারতের পার্লামেন্টে পাস হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সেটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
বিএনপিও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পার্লামেন্টের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়। একই সময়ে তারা আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা অব্যাহত রেখেছিল, যার মধ্যে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়াও ছিল। চুক্তির আওতায় ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের অভিনন্দন জানান। তাঁদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছিল বিএনপিও।
আজকের রাজনৈতিক বিতর্কে এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। ক্ষমতার পালাবদলের পর আগের সরকারের প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় এলে আগের সরকারের সময় স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি বৈধতা হারায় না। স্থলসীমান্ত চুক্তি ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব, প্রশাসন ও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক দশকের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়েছে। এটি কোনো একটি দলের নয়; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অর্জন। তবে এর অর্থ এই নয় যে চুক্তিটির সমালোচনা করা যাবে না। বরং এর অর্থ হলো, সমালোচনা হতে হবে চুক্তির বিষয়বস্তু ও ফলাফলের ভিত্তিতে, এর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
সমুদ্রসীমার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য:
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ঘটনাটিও একই শিক্ষা দেয়। দীর্ঘদিনের বিরোধের পর বাংলাদেশ সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনের আওতায় সালিসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়। ২০১৪ সালে সালিসি ট্রাইব্যুনাল রায় দেয় এবং দুই দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হয়। এর ফলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার বেড়ে যায়। ভারতও ওই রায় মেনে নেয়।
অর্থাৎ, একটি আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে কোন সরকার কতটা কৃতিত্ব দাবি করবে, সেটি আলাদা বিষয়। কিন্তু নির্ধারিত সমুদ্রসীমা এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা। এখন বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই সমুদ্রসীমা থেকে বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা নিতে পেরেছে। কোন দল কৃতিত্ব পাবে, সেটি তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আদানি চুক্তি দেখাচ্ছে প্রকৃত পর্যালোচনা কেমন হতে পারে:
ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎবিষয়ক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্ন ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, কিছু চুক্তিতে সরাসরি বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত, যেগুলোর বাস্তব পর্যালোচনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সীমান্তপথে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে। এর মধ্যে ঝাড়খন্ডের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে ২০১৭ সালে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিও রয়েছে।
চুক্তিটি এখন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আইনি বিরোধের বিষয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ গড়ে প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা দিয়েছে। ভারতের অন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সরবরাহ করা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল ৯ টাকা ৫৭ পয়সা। কর-সুবিধার বিষয়টিও চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রশ্ন তুলেছে। পরবর্তী সময়ে বিরোধটি আন্তর্জাতিক সালিসি প্রক্রিয়ায় যায়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ হাইকোর্ট সালিসি প্রক্রিয়া স্থগিত করে এবং চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠনের বিষয়টি সামনে আসে।
এ ধরনের চুক্তিই একটি সরকারি পর্যালোচনার বাস্তব প্রয়োজন দেখায়। প্রশ্নগুলো এখানে রাজনৈতিক স্লোগানের নয়; চুক্তি ও অর্থনীতির। বিদ্যুতের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল? কোন কোন ব্যয় হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয়েছিল? কী ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল? একই ধরনের অন্য সরবরাহকারীদের ক্ষেত্রে শর্ত কি আলাদা? চুক্তিতে কী বলা আছে? বাংলাদেশ আইনগতভাবে কোন বিষয় পরিবর্তন করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন চুক্তির নথি, আর্থিক হিসাব, আইনগত বিশ্লেষণ ও দর-কষাকষি। কোনো চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ না করেই শুধু ‘ভারতপন্থী’ বা ‘বাংলাদেশবিরোধী’ বলে আখ্যা দিলে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।
আগের পর্যালোচনাও একটি শিক্ষা:
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি পর্যালোচনার ঘোষণা বিএনপি সরকারেরই প্রথম নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও একই ধরনের পর্যালোচনা করেছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ভারতের কাছ থেকে টাগবোট কেনার একটি চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। আদানি বিদ্যুৎ চুক্তিসহ আরও কয়েকটি প্রকল্প সংশোধন বা বাতিলের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছিল।
এ অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—যে কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির পর্যালোচনার ঘোষণা দেওয়া সহজ, কিন্তু তার ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নীতিগত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন। একটি কার্যকর পর্যালোচনার ফলাফলের ক্ষেত্রে সরকারি নথি ও ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কোনো চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হলে সরকারকে বলতে হবে কেন। পুনর্বিন্যাস করা হলে বলতে হবে বাংলাদেশ কী পেল। আর চুক্তি বহাল রাখলে কেন রাখা হলো, সেটিও ব্যাখ্যা করা উচিত। তা না হলে ‘পর্যালোচনা’ একটি রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
‘কানেক্টিভিটি’ মানেই ছাড় নয়:
কানেক্টিভিটি বা যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারত অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকলের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৪৬ লাখ ৮০ হাজার টন পণ্য পরিবহন হয়েছে বলে ভারতের অভ্যন্তরীণ নৌপথ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এসব ব্যবস্থায় ভারত সুবিধা পায়, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সহজ হয়। কিন্তু ভারত সুবিধা পাচ্ছে—এটুকু দিয়ে প্রমাণ হয় না যে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে আছে, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়ার মূল ভূখণ্ড এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নির্বিঘ্ন পরিবহন যোগাযোগ বাংলাদেশের জাতীয় আয় সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। এতে ভারতও লাভবান হবে। তাই নীতিগত প্রশ্ন হওয়া উচিত ভারত লাভবান হচ্ছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশের যথেষ্ট লাভ হচ্ছে কি না।
কোনো প্রতিবেশী দেশও সুবিধা পাবে বলে প্রতিটি ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করাই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা নয়। জাতীয় স্বার্থ রক্ষার একটি উপায় হলো এমন শর্তে সমঝোতা করা, যাতে বাংলাদেশের জন্য গ্রহণযোগ্য সুফল নিশ্চিত হয়।
পানি হবে কূটনীতির বড় পরীক্ষা:
১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সামনে আরও তাৎক্ষণিক একটি কূটনৈতিক প্রশ্ন তৈরি করছে। ফারাক্কায় শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির জন্য এই চুক্তিতে একটি ফর্মুলা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সাল থেকে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রতিবছর চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়েছে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে অর্থাৎ এ বছরই শেষ হওয়ার কথা। তাই এর নবায়ন বা পুনর্নির্ধারণ এখন সরাসরি নীতিগত প্রশ্ন।
তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নতি প্রয়োজন—এমন যুক্তি দেওয়া এবং চুক্তিটির অস্তিত্বই কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রমাণ—এ দুটো এক কথা নয়। বাংলাদেশ যদি মনে করে যে বর্তমান চুক্তি তার স্বার্থ যথেষ্ট সুরক্ষা দিচ্ছে না, সরকারকে সে ক্ষেত্রে পানির প্রবাহ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরতে হবে, কোথায় সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করতে হবে এবং আলোচনায় বাংলাদেশের লক্ষ্য কী হবে, সেটি স্পষ্ট করতে হবে।
তিস্তার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিরোধটি এখনো অমীমাংসিত। বাংলাদেশ আরও ভালো একটি ব্যবস্থা চাইতেই পারে। তবে অমীমাংসিত বিষয়ে আলোচনা এবং ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া চুক্তি এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক সালিসি রায় বা পারস্পরিকভাবে মেনে নেওয়া সীমান্ত নিষ্পত্তিকেও এমন কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে দেখা উচিত নয়, যা সরকার বদলালেই বাতিল বা এর বৈধতা নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করা যাবে।
সরকার বদলালেও পররাষ্ট্রনীতি টিকে থাকতে হয়:
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত সরকার বদলায়। রাষ্ট্র থাকে। তাই সীমান্ত, পানি, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, পরিবহন, নিরাপত্তা কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে ক্ষমতায় থাকা দলের রাজনৈতিক সম্পত্তি হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত নয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত বিএনপি পর্যালোচনা করতেই পারে। কোনো চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হলে সেটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কোনো চুক্তিতে গুরুতর ত্রুটি থাকলে তা নিয়ে আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। পরিস্থিতি বদলে গেলে পুনরায় আলোচনা করাও স্বাভাবিক। তবে এসব পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ দেখানোর দায়িত্ব সরকারের।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, পানি, পরিবহন ও নিরাপত্তার নানা ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। মতবিরোধ থাকবেই। সরকারের দায়িত্ব হলো সেই মতবিরোধ সামলানো, পুরো সম্পর্ককে যেন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি গণভোটে পরিণত না করা।
স্থলসীমান্ত চুক্তির ইতিহাস এখানে একটি উদাহরণ হতে পারে। বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতা করেও এমন একটি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, যা তিনি বাংলাদেশের জন্য উপকারী বলে মনে করেছিলেন।
আজ বিএনপির সামনেও একই রাজনৈতিক পার্থক্য বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের নীতি পর্যালোচনা ও সংশোধন করা যায়, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আগের সরকারের সময়ে নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত বা সে সময়ের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শুরু থেকেই সন্দেহজনক হিসেবে দেখতে হবে।
১০১টি চুক্তির পর্যালোচনায় কী থাকা উচিত?
এই পর্যালোচনা যদি রাজনৈতিক প্রদর্শনী না হয়ে বাস্তব নীতিনির্ধারণের প্রক্রিয়া হতে হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি সরল প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার। চুক্তিতে আসলে কী আছে? বাংলাদেশ কী কী দায়িত্ব নিয়েছে? বাংলাদেশ কী পেয়েছে? চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছে কি না? এর ফলে অর্থনৈতিক, কৌশলগত বা নিরাপত্তাগত কী পরিমাপযোগ্য সুবিধা হয়েছে? কী ধরনের ব্যয় বা সমস্যা তৈরি হয়েছে? চুক্তিটি সংশোধন, পুনরায় আলোচনা নাকি বাতিল করা প্রয়োজন? আর পুনরায় আলোচনা প্রয়োজন হলে ভারতীয় পক্ষের কাছে বাংলাদেশ ঠিক কী চাইবে? এসব প্রশ্নের উত্তর থাকলে পর্যালোচনাটি অর্থবহ হবে।
তখন সরকার এমন চুক্তিগুলো আলাদা করতে পারবে, যেগুলো সত্যিই সংশোধন করা প্রয়োজন, আর এমন চুক্তিগুলোও আলাদা করা যাবে, যেগুলো কেবল রাজনৈতিক কারণে অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে—কারণ সেগুলো কোনো এক সময়ের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সরকারের সময়ে করা হয়েছিল। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশকে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি নিতে হবে না, যেখানে আগের সরকারের করা প্রতিটি চুক্তি সন্দেহের চোখে দেখা হয়। আবার ধারাবাহিকতার নামে কোনো চুক্তিকেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা দরকার নেই। প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যেখানে চুক্তি বিচার হবে তথ্য, বাস্তব ফলাফল এবং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ভিত্তিতে। কোনো চুক্তি ক্ষতিকর হলে পরিবর্তন করতে হবে এবং কেন করা হলো তা জানাতে হবে। উপকারী হলে বহাল রাখতে হবে এবং তার সুফল ব্যাখ্যা করতে হবে। ত্রুটি থাকলে পুনরায় আলোচনা করতে হবে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল, তা জানাতে হবে।
আর কোনো আন্তর্জাতিক বিষয় যদি চুক্তি, সালিসি রায় বা অন্য কোনো স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরুর জন্য সরকার পরিবর্তনের বাইরেও যথেষ্ট বাস্তব কারণ থাকা প্রয়োজন।
বিএনপির ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার আসল মূল্যায়ন তাই কতগুলো চুক্তিকে পর্যালোচনার আওতায় আনা হলো, সেটিতে নয়। পর্যালোচনা শেষে কী করা হলো, সেটিই আসল বিষয়। অতীতকে পর্যালোচনা করা আর দেশ পরিচালনা করার মধ্যে পার্থক্য এখানেই।





