জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ এল নিনো নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকট যখন চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই একটি নজিরবিহীন এল নিনো আমাদের চোখের সামনেই অতিদমনীয় রূপ ধারণ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, গত অন্তত এক হাজার বছরের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বগ্রাসী এল নিনো।
প্রলয়ংকরী এই পরিস্থিতির সমন্বিত প্রভাবে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসের এ যাবতকালের সবচেয়ে উত্তপ্ত বছর হিসেবে পূর্বের সব রেকর্ড গুঁড়িয়ে দিতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের উপকণ্ঠ থেকে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় এর ভয়াবহ প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক তীব্র দাবানল, ভারতে মৌসুমি বায়ুর দুর্বলতা কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মারাত্মক খরা; সবকিছুতেই এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম সতর্ক করে জানিয়েছে, এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষকে তীব্র ক্ষুধার দিকে ঠেলে দেবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো এমন একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরে বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে ওঠে এবং বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ তাপ সঞ্চারিত হয়। গত সোমবার সংগৃহীত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এল নিনোর কেন্দ্রস্থলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী নভেম্বরে এর মাত্রা গড়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন জলবায়ু বিশ্লেষক জেকে হাউসফাদার। প্রবাল, গাছের বলয় ও ঐতিহাসিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক হাজার বছরে এতটা শক্তিশালী তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর দেখা যায়নি। উপরন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, মানুষের তৈরি বিশ্ব উষ্ণায়ন এখন এল নিনোকে আরও শক্তিশালী করছে, যা পরবর্তীতে জলবায়ু সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, বৈজ্ঞানিক তথ্যে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই; পৃথিবী এখন এক অজানা এবং অতি-বিপজ্জনক আবহাওয়ার অঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এখন মূল লড়াইটা হলো জলবায়ু ঝুঁকি আর মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে।
অন্যদিকে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রধান সেলেস্তে সাওলো জানিয়েছেন, তাদের ৫০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম জাতীয় আবহাওয়া দপ্তরগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে এতো বড় আকারের জরুরি প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। এই দুর্যোগের হাত থেকে জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে হাতে আর এক মুহূর্তও সময় নেই। আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন, এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়বে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে ফেলবে।
সূত্র: গার্ডিয়ান





