আমার চেনা মুজিব ভাই

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

স্মৃতিকথা

কথাটা কোন বিজ্ঞানী বলেছেন আমার স্মরণ নেই। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন কি? ‘আমি জ্ঞানসমুদ্রের উপকূলে কিছু নুড়ি কুড়িয়েছি মাত্র। ’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গত ৪০ বছরে আমি শতাধিক লেখা লিখেছি। তা ওই বিজ্ঞানীর মহাসমুদ্রের উপকূলে কিছু নুড়ি কুড়ানোর মতো।

সম্ভবত তাঁকে নিয়ে লেখার পর লেখা লিখতে পারি। বঙ্গবন্ধুর জীবন যেন একটি মহাকাব্য—যতই পাতা ওল্টাই, পাতা ফুরায় না।

সিজারকে হত্যার পর অনুতাপদগ্ধ ব্রুটাস নাকি বলেছিল, ‘এত দীর্ঘকাল তার সান্নিধ্যে থেকেও বুঝতে পারিনি তিনি কত বড় মহাবীর ছিলেন। ’ বঙ্গবন্ধুও জীবিত থাকতে আমরা বুঝতে পারিনি তিনি কত বড় মানুষ ছিলেন, কত বড় নেতা ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আগে আমরা সবাই তাঁকে মুজিব ভাই ডাকতাম। তিনি নিজেও একবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমাকে নেতা মনে করবেন না, নেতা হলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁরা কবরে শুয়ে আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমি নেতা নই, আমি আপনাদের মুজিব ভাই। ’

নিজের সম্পর্কে ঠিক এমন কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি লিখেছিলেন, ‘মোর নাম এই বলে পরিচিত হোক/আমি তোমাদেরই লোক। ’ অর্থাৎ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনিও একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু কী অসাধারণত্ব নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর জীবনকালেই। মৃত্যুর পরও প্রায় শতবর্ষ ধরে তিনি জীবিত। থাকবেন জীবিত অনন্তকাল ধরে।

বঙ্গবন্ধু এই অমরত্ব নিয়ে জন্মেছিলেন, এখনো তিনি মৃত্যুঞ্জয় হয়ে সব বাঙালি হৃদয়ে অবস্থান গ্রহণ করছেন। বিশ্বের দরবারে বাঙালি ও বাংলাদেশকে পরিচিত করিয়েছেন দুজন মানুষ—একজন রবীন্দ্রনাথ, অন্যজন শেখ মুজিব। আমি বিশ্বের দু-একটি দেশ ছাড়া সব দেশে ঘুরেছি। শুনেছি, একসময় Tegor’s Country বলতেই সবাই বুঝত বাংলাদেশ। আমিও সারা বিশ্ব ঘুরতে গিয়ে দেখেছি, শেখ মুজিব কথাটি বললেই সবাই বোঝে বাংলাদেশ।

আমি গর্বিত দীর্ঘকাল এমন একটি মানুষের সান্নিধ্য ও সাহচর্য পাওয়ার জন্য। তাঁকে আমি মুজিব ভাই বলে ডাকতাম, সে কথা আগেই লিখেছি। তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত এই নামে ডেকেছি। বঙ্গবন্ধু বলার সুযোগ তিনি আমাকে দেননি। সুযোগ পেয়েছি তাঁর মৃত্যুর পর। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিত হন। সবাই তাঁকে ডাকতেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ তাঁকে ডাকতেন লিডার। এই সময়েও আমাদের চার বন্ধুকে তিনি কখনো বঙ্গবন্ধু বলে সম্বোধন করার অনুমতি দেননি।

আমরা এই চার বন্ধু হলাম—আমি, এ বি এম মূসা, ফয়েজ আহমদ, এম আর আখতার মুকুল। আমরা তাঁকে বঙ্গবন্ধু সম্বোধন করতে গেলে দুঃখ পেতেন, বলতেন, ‘বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। কত দিন মুজিব ভাই সম্বোধনটা শুনি না। তোরাও আমাকে বঙ্গবন্ধু বলে ডাকতে চাস!’ বঙ্গবন্ধুর এই কথাটা এ বি এম মূসা মনে রেখেছিলেন। নিজের মৃত্যুর আগে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণা করে একটা বই লিখেছেন, তার নাম ‘মুজিব ভাই’। আমার এই লেখাটিরও তাই নাম দিয়েছি ‘আমার চেনা মুজিব ভাই’।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যা করার সময় (১৯৭৫) আমি দেশে ছিলাম না। বিদেশে বসে এই মর্মান্তিক খবর পেয়েছি। তারপর দীর্ঘ ১৮-১৯ বছর দেশে যাইনি। ১৯৯২ সালে যখন দেশে যাই, তখন বিএনপি ক্ষমতায়। তাদের প্রচণ্ড দাপট। তবু টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা জানানোর সিদ্ধান্ত নিই। এ ব্যাপারে শেখ ফজলুল করিম সেলিম আমাকে সাহায্য করেন। টুঙ্গিপাড়ায় যাওয়ার জন্য তিনি আমাকে ড্রাইভারসহ গাড়ি দিয়ে সাহায্য করেন। টুঙ্গিপাড়ায় তাঁদের দোতলা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করেন, খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

এক রাত টুঙ্গিপাড়ায় কাটিয়ে পরদিনই ঢাকায় এক সভায় আমার যোগ দেওয়ার কথা। সভা হবে বিকেল ৫টায়। ড্রাইভার আমাকে বলেন, ‘ঢাকায় যদি সময়মতো ফিরতে চান, তাহলে ভোরে ফজরের নামাজের আগে রওনা দিতে হবে। কারণ তাবলিগ জামাতের লোকরা তুরাগ নদের দিকে আসছে। এটা বিশ্ব ইজতেমার দিন। রাস্তা বন্ধ থাকবে মানুষের ভিড়ে। এই ভিড় হওয়ার আগেই আমাদের পদ্মার ফেরি পার হতে হবে। ’

টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছে বঙ্গবন্ধুর মাজারে গেলাম। তখনো বর্তমানের বিশাল স্মৃতিসৌধ তৈরি হয়নি। উন্মুক্ত আকাশতলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পিতার কবর পাশাপাশি। কবরের দুই পাশ ও ওপরটায় বসানো ইটের ওপর সাদা খড়িমাটির মতো রং। জিয়ারত শেষে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই অতীতের অনেক স্মৃতি মনে পড়ল। চোখে পানি এলো। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতে ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি তাঁর আত্মজীবনীর ডিকটেশন নেওয়ার জন্য দুপুরে গণভবনে যেতাম। দুপুরের আহারের পর তিনি গণভবনের দোতলায় একটি প্রশস্ত কক্ষে বিছানায় শুয়ে এই লেখার ডিকটেশন দিতেন।

রোজ দুপুরে এই ডিকটেশন নেওয়ার জন্য আমাকে পুরনো গণভবনে আসতে হতো। এই ডিকটেশন কখনো আমি একা নিতাম, কখনো তোয়াব খান আমার সঙ্গে যোগ দিতেন। বঙ্গবন্ধু একটি খাটে শুয়ে তাঁর আত্মজীবনীর ডিকটেশন দিতেন। বিছানায় শোয়া অবস্থায় তাঁর গায়ের ওপর থাকত সাদা চাদর। ডিকটেশন নেওয়া শেষ হলে তিনি কখনো কখনো বলতেন, ‘তুমি আর কিছুক্ষণ থাকবে, বিকেলের চা-টা খেয়ে যাবে। ’ বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য এমনই আকর্ষণীয় ছিল যে আমি মাঝে মাঝে থেকে যেতাম সন্ধ্যা পর্যন্ত।

তাঁর মৃত্যুর পর টুঙ্গিপাড়ায় সাদা রঙের ইটের গাঁথুনি দেওয়া তাঁর কবরের দিকে চেয়ে মনে হলো, আমি গণভবনে এসেছি এবং মুজিব ভাই সাদা চাদর গায়ে আমার সামনে শুয়ে আছেন। সহজে আমি কাঁদি না, সেই সন্ধ্যায় কেঁদেছি। জানি না কেন বারবার মনে হচ্ছিল, বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘গাফ্ফার, তুমি এত সকালে চলে যাবে?’ আমি বলছি, ‘না মুজিব ভাই, আমি যাচ্ছি না। ’ টুঙ্গিপাড়ায় আমার সঙ্গে ছিলেন আমার ছোট ভায়রা খালেদ। তিনি তাগাদা দিয়ে আমার মনের বিভ্রম ভাঙালেন। বললেন, ‘আগামীকাল খুব ভোরে আমাদের ঢাকায় ফিরতে হবে। এখন বাসায় ফিরে গোছগাছ না করলে ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারব না। ’

তাঁর কথায় শেখ সেলিমদের বাসায় ফিরে এলাম। মনে মনে কবর ছুঁয়ে বললাম, ‘মুজিব ভাই, ক্ষমা করবেন। কাল খুব সকালে ঢাকায় রওনা হতে হবে। তাই এখনই চলে যাচ্ছি। নইলে আপনার কাছে আরো কিছুক্ষণ বসতাম। ’ মনে হলো বঙ্গবন্ধু বলছেন, ‘আমি ছুটি না দিলে এত সহজে যেতে পারবে?’ রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি মনে পড়ল, ‘যেতে নাহি দিব, তবু যেতে দিতে হয়। ’ পরদিন ফজরের নামাজের আজানের আগে শেখ সেলিমের দেওয়া জিপগাড়িতে রওনা হলাম ঢাকায়। টুঙ্গিপাড়া থেকে গোপালগঞ্জ বাজার বেশি দূরে নয়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। এই আসার পথে দেখলাম একটি প্রাচীন গাছ। এই গাছের নিচে মাঠে জনসভা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে প্রথমবারের মতো সঙ্গে নিয়ে। এই গাছটি পরে কেটে ফেলতে চেয়েছিল মুসলিম লীগ সরকার। এলাকার লোকজন বাধা দেওয়ায় কাটতে পারেনি।

গোপালগঞ্জে যে স্কুলে বঙ্গবন্ধু লেখাপড়া শিখতেন, যে নদীর পারে ফুটবল খেলেছেন, যে ক্লাবে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা দিয়েছেন—সবই একঝলক দেখেছি। হাতে সময় ছিল না, তবু গোপালগঞ্জে একটু ঘুরেছি। ঘোরা শেষ না হতেই ঘটল সেই ভয়ংকর ঘটনা। বোমা ফাটার মতো শব্দ করে আমাদের জিপের দুটি টায়ার ফেটে গেল। সর্বনাশ! ড্রাইভার জানালেন, গোপালগঞ্জে তাঁর জানা টায়ার ও গাড়ি সারানোর একটি দোকান আছে। আমরা যদি একটা চায়ের দোকানে ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষা করি, তাহলে গাড়ি ও টায়ার দুই-ই মেরামত করা যাবে।

একটা খাপরার ঘর, সামনে টুল বিছানো খদ্দেরদের জন্য। মাটির চুলায় সবে আগুন ধরানো হয়েছে। চুলার ওপর বিরাট কেটলি বসানো। পানি গরম হচ্ছে। এটাই তখনকার গোপালগঞ্জ টি হাউস। আমাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কয়েকজন স্থানীয় নেতা ছিলেন। তাঁরা সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিলেন। অঘ্রান মাসের শীতের আমেজ ভরা সকালে খাপরার ঘরের চায়ের দোকানে বসে কাচের গ্লাসে চা খেতে ভালোই লাগছিল। এমন সময় ড্রাইভার এলেন ভগ্নদূত হয়ে। বললেন, শুধু জিপটির টায়ার নয়, তার ইঞ্জিনেও কিছু ক্ষতি ধরা পড়েছে। মেরামত করতে বিকেল হয়ে যাবে। এখন তো মাত্র ভোর।

আমাদের মাথায় বাজ পড়ল। এখন আমরা কী করি? গোপালগঞ্জের দু-একজন আওয়ামী লীগ নেতা তাঁদের বাড়িতে সময়টা কাটাতে আমন্ত্রণ জানালেন। আমি রাজি হলাম না। টুঙ্গিপাড়া আমাকে টানছিল। আওয়ামী লীগের এক নেতা তাঁর গাড়িতে আমাদের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যেতে রাজি হলেন। আমাদের ড্রাইভার গোপালগঞ্জে থাকবেন। গাড়ি ঠিক হলে টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে আমাদের নিয়ে ঢাকায় রওনা হবেন। ঢাকায় পৌঁছব অনেক রাতে। সেখানকার সভায় যোগ দেওয়ার আশা ছেড়ে দিতে হলো।

টুঙ্গিপাড়ায় ফিরে আসতেই শেখ সেলিমের বাসার আত্মীয়-স্বজন বিস্মিত হওয়ার সঙ্গে আনন্দিতও হলেন। আবার রান্নাবান্নার ধুম পড়ল। ঠিক করলাম, দুপুরের খাওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুর মাজারে আরেকবার যাব। আমার কথা শুনে সঙ্গীসাথি জুটে গেল। শেখ পরিবারের বাড়ির সামনেই এই মাজার। সুতরাং বেশিদূর হাঁটতে হলো না।

স্পষ্ট মনে আছে, সকালটা ছিল সূর্যের আভায় উদ্ভাসিত। এখন আকাশ মেঘমেদুর। টুঙ্গিপাড়ার দেহে কিশোরীর মতো শ্যামল শোভা। একবার মনে মনে ভেবেছি, এখানেই দেশের রাজধানী স্থানান্তর করে নতুন রাজধানীর নাম মুজিবনগর রাখা হলে কেমন হতো। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীর নাম ওয়াশিংটন রাখার মতো। নিজের মনের অমূলক চিন্তাটা দূর করে বঙ্গবন্ধুর কবরের মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আরেকবার জিয়ারত সেরে মোনাজাতের জন্য দুই হাত তুলেছি, চোখে আবার বিভ্রমটা নেমে এলো।

মনে হলো, ঢাকায় গণভবনে বঙ্গবন্ধুর শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে আছি। কবরের সাদা ইটগুলোকে মনে হলো সাদা চাদর। বঙ্গবন্ধু সাদা চাদর গায়ে শুয়ে আছেন, আমার দিকে মিটিমিটি হাসিমাখা মুখে তাকিয়ে বলছেন, ‘কি হে, যেতে পারলে? আমার অনুমতি ছাড়া যেতে পেরেছ? তাইতো ফিরে আসতে হয়েছে। ’ অনেকক্ষণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘোর কাটতে সময় লেগেছিল।

পাঠকদের কাছে আগেই বলে রাখি, এই লেখাটি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ওপর কোনো আলোচনা নয়। এটা তাঁকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা। তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি দীর্ঘকাল—সেই ১৯৪৯ সালে তিনি যখন ছাত্রনেতা, তখন থেকে। তিনি জেলে থাকার সময় একবার তাঁর সঙ্গে জেলে থেকেছি। ভাবির (মুজিবপত্নী) সঙ্গেও সম্পর্ক ছিল গভীর। ৩২ নম্বর বাড়িতে গেলেই ভাবি বলতেন, ‘ভাই, না খেয়ে যেয়ো না। ’ তাঁকে আমার মনে হতো ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসের মায়ের চরিত্রের মতো। তাঁর বিচিত্র জীবন নিয়ে গোর্কির ‘মা’-এর মতো উপন্যাস লেখা যায়। আমি কেন লিখতে পারলাম না তা নিয়ে এখন মনে পরিতাপ হয়।

এই লেখাটি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে থাকার সময়ে আমার জীবনের খণ্ড খণ্ড ছবি। সব খণ্ড একত্র করে ‘বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি’ নামে একটি বড় বই প্রকাশের ইচ্ছা আছে। এই স্বল্প পরিসরের লেখায় কয়েকটি ছবি মাত্র তুলে ধরলাম। আমি যে যুগের মানুষ, সে যুগে জীবিত ছিলেন গান্ধী, জিন্নাহ, ফজলুল হক, নেহরুর মতো বিরাট মাপের রাজনৈতিক নেতা এবং রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরত্চন্দ্র, জীবনানন্দ দাশের মতো কালজয়ী মানুষ। তাঁদের কাউকে দেখার সুযোগ আমার হয়নি, একমাত্র অসুস্থ নজরুলকে দেখা ছাড়া। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। তাঁকে দেখার মধ্য দিয়ে বিশ্বের সব মহামানবকে দেখার সাধ আমার পূর্ণ হয়েছে।

১৯৪৯ সালে বরিশাল শহরে যখন প্রথম বঙ্গবন্ধুর দেখা পাই, তখন তিনি ছাত্রলীগের নেতা। তখনই শেখ সাহেব—এই এক নামে তিনি সর্বত্র পরিচিত। আমি তখন স্কুলের ছাত্র। নবম শ্রেণিতে পড়ি। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হতেই বলেছিলেন, ‘ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা দিয়ে ঢাকায় চলে এসো। তুমি ছাত্রলীগে যোগ দাওনি কেন?’ বলেছি, আমার বাবা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অনুসারী। তাঁর মৃত্যুর পর নেতাজি সুভাষ বসুর ফরোয়ার্ড ব্লকে যোগ দিয়েছিলেন। মৃত্যুকাল পর্যন্ত বরিশাল জেলা কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। আমি তাঁর ছেলে হয়ে কী করে সাম্প্রদায়িক মুসলিম ছাত্রলীগে  যোগ দিই?

মুজিব ভাই বলেছিলেন, ‘আমিও সাম্প্রদায়িকতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। কিন্তু কী করব! ভাগ্যচক্রে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে হচ্ছে। বেশিদিন করব না। দু-এক বছরের মধ্যে ছাত্রলীগকে অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করব। এই মুহূর্তে তা করা সঠিক হবে না। ’ বরিশাল শহরে অশ্বিনীকুমার টাউন হলের পাশে চলন্তিকা নামের একটি রেস্টুরেন্ট (এখন নেই) ছিল। এই রেস্টুরেন্টে বসে মুজিব ভাইয়ের একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। তখন বরিশালে নকীব নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। তাতে এই ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছিল। এটা আমার জীবনের প্রথম ইন্টারভিউ নেওয়া। নকীবে তখন আমি স্কুলের ছুটির ফাঁকে নবিশ সাংবাদিক ছিলাম। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক নূর আহমদ।

১৯৫০ সালে আমি ম্যাট্রিক পাস করি। বরিশাল থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। প্রথমে কলেজ হোস্টেলে জায়গা না পেয়ে নীলক্ষেত ব্যারাকে বড় ভাই হোসেন রেজা চৌধুরীর কাছে এসে উঠি। তিনি তখন সেক্রেটারিয়েটে সিভিল সাপ্লাই ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। তখনো তৃতীয় শ্রেণির সরকারি অফিসারদের জন্য কোয়ার্টার তৈরি হয়নি। নীলক্ষেতে সারি সারি ব্যারাক তৈরি করে তৃতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সরকারি কর্মচারীদের সপরিবারে এই ব্যারাকে থাকার ব্যবস্থা ছিল না। বিবাহিতদেরও এই ব্যারাকে ব্যাচেলর জীবন যাপন করতে হতো। আমি এই ব্যারাকে বড় ভাইয়ের সঙ্গে কিছুদিন ছিলাম।

ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার হাঙ্গামা শেষ হতেই মুজিব ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। তিনি কোথায় থাকেন তা তখন আমি জানি না। হঠাৎ মনে পড়ল সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার কথা। ১৯৪৯ সালে বরিশাল শহরে থাকার সময়ই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার খবর পাই। কিছুদিন পরই হাতে আসে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকা। হাফ ডিমাই সাইজ। আট পৃষ্ঠা। ছাপার অক্ষর তেমন ভালো নয়। প্রথম পৃষ্ঠার মাস্তুলে লেখা মওলানা আবদুল হামিদ খান কর্তৃক পরিচালিত। সম্পাদক ফজলুর রহমান খাঁ। দৈনিক আজাদের সহসম্পাদক মুজিবুর রহমান খাঁর ছোট ভাই। পুরনো ঢাকার কারকুনবাড়ি লেন থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

ঠিক করলাম, কারকুনবাড়ি লেনে গিয়ে মুজিব ভাইয়ের সন্ধান করব। ঢাকা কলেজও তখন পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে ছিল। একদিন কলেজের ক্লাস শেষে কারকুনবাড়ি লেনের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। পুরান ঢাকার আদালত ভবনগুলোর উল্টো দিকে ছোট গলি। সেই গলির নাম কারকুনবাড়ি লেন। দোতলা পুরনো বাড়ি, জীর্ণশীর্ণ। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে হয়। সেখানে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক অফিস। সেখানে পৌঁছে দেখি, আমার অনুমান ঠিক। সেই দীর্ঘ ছয় ফুটের বেশি লম্বা, ছিপছিপে একহারা চেহারা, শ্যামলা রঙের আমার মুজিব ভাই একটা হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ারে বসে এক ব্যক্তিকে কী যেন বোঝাচ্ছেন।

আলাপ হতে জেনেছি, ওই ব্যক্তি ইত্তেফাকের সম্পাদক ফজলুর রহমান খাঁ। ছোটখাটো মানুষটি। ঠোঁটে ঘন গোঁফ। গভীর মনোযোগের সঙ্গে শেখ মুজিবের কথা শুনছেন। আমাকে দেখেই শেখ মুজিব হৈচৈ করে উঠলেন। বললেন, ‘আরে গাফ্ফার না, ঢাকায় কবে এসেছ?’ বললাম, ‘মাসখানেক হয়। ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছি। ’

—ওহ্, ম্যাট্রিক পাস করে ফেলেছ?

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। বিস্মিত হলাম তাঁর স্মরণশক্তি দেখে। তিনি আমাকে বরিশালে মাত্র একবার কি দুবার দেখেছেন, তাতেই আমাকে এত দিন পর একবার দেখেই চিনে ফেলেছেন। এমনকি বরিশালে আমাকে দেখার সময় আমি যে বছরখানেক পর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেব তা-ও মনে রেখেছেন!

ফজলুর রহমান খাঁ এবং ইত্তেফাকের কর্মীদের সঙ্গে তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ফজলুর রহমান খাঁ চায়ের অর্ডার দিলেন সবার জন্য। মুজিব ভাই বললেন, ‘তুমি আজ এসেছ, ভালো করেছ। তোমাকে একটা কাজের দায়িত্ব দেব। সেটা পরে বলছি। আগে আজ এখানে কেন এসেছি তা বলছি। ’ বলেই তিনি তাঁর পাইপে তামাক ভরে আগুন জ্বালালেন। তিনি যে যুবনেতা থাকা অবস্থায়ই পাইপ টানতেন, সেটা সেদিন আমার জানা হয়।

আমি নিশ্চুপ। মুজিব ভাই বললেন, ‘আগামীকাল ভিক্টোরিয়া পার্কে (এখন বাহাদুর শাহ পার্ক) আমাদের একটা জনসভা হবে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের জন্য মুসলিম লীগ সরকার ঢাকায় থাকার কোনো ব্যবস্থা করেনি। অনেককে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে নীলক্ষেত ব্যারাক, পলাশী ব্যারাকে একা থাকতে হয়। অথচ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি অফিসারদের জন্য আজিমপুর কলোনি তৈরি হয়েছে। এই অব্যবস্থার প্রতিবাদে সভাটি হবে। মওলানা ভাসানী বক্তৃতা দেবেন। দৈনিক আজাদ মুসলিম লীগের কাগজ। আমাদের খবর ছাপতে চায় না, তুমি এই সভার রিপোর্ট লিখে ফজলুর রহমান সাহেবকে দেবে। ওটা আমরা ইত্তেফাকে ছাপব। ’

ফজলুর রহমান খাঁর দিকে চেয়ে বললেন, ‘গাফ্ফারের সাংবাদিকতায় ভালো হাত। বরিশালে ও আমার ইন্টারভিউ নিয়েছিল। খুবই ভালো হয়েছে। আগামীকাল যে সভা হবে, তারও ভালো রিপোর্ট লিখতে পারবে। ’ আমি সম্মতি জানালাম। বললাম, ‘বিকেলে ভিক্টোরিয়া পার্কের জনসভা। আমাকে কলেজ কামাই করতে হবে না। রিপোর্ট লিখে এখানে পৌঁছে দিতে পারব। ’

শেখ মুজিব বললেন, ‘এই রিপোর্ট লেখার জন্য ইত্তেফাক তোমাকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে পারবে না। দেখছ না কাগজের চেহারা। কষ্টেসৃষ্টে চালানো হয়। মওলানা ভাসানী এবং আমি মাঝে মাঝে কিছু কিছু টাকা তুলে পত্রিকাটিকে দিই। ’

আমি সলজ্জ মুখে বললাম, ‘না মুজিব ভাই, এই রিপোর্ট লেখার জন্য আমি কোনো টাকা-পয়সা চাই না, আপনারা অনুমতি দিলে আমি মাঝে মাঝেই এ ধরনের রিপোর্ট লিখে ইত্তেফাককে দিতে পারব। আমাকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না। ’

—চা পানের সময় শেখ মুজিব বললেন, ‘তোমার বাড়ি বরিশালের কোথায়?’ বললাম, মেহেন্দীগঞ্জ থানার উলানিয়ায়।

—উলানিয়ায় তো জমিদার পরিবারের বাস। তুমি কি এই বংশের কেউ?

সবিনয়ে বললাম, ‘জি, আমি এই পরিবারের একজন। ’

—তাহলে তোমার তো টাকা-পয়সার সমস্যা নেই!

বললাম, জি না, আছে। জমিদার পরিবারের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। আমার মা-বাবা মারা গেছেন। আমি টিউশনি করে, লোকাল নিউজপেপারে কাজ করে আমার স্কুলে লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছি।

শেখ মুজিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সহানুভূতি ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘এখন তুমি সরকারি ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছ। লেখাপড়ার খরচ চালাবে  কী করে?’

আমি দ্বিধা করলাম না। তাঁকে জানালাম, বংশাল রোড থেকে দৈনিক ইনসাফ নামের একটি দৈনিক কাগজ বেরিয়েছে। সেই কাগজে চাকরির চেষ্টা করছি।

মুজিব ভাই বললেন, ‘কাগজটি সরকারবিরোধী, মালিক বলিয়াদীর জমিদার আশরাফ হোসেন সিদ্দিকিকে আমি চিনি। তুমি যদি বলো, আমি তাঁকে অনুরোধ জানাতে পারি। ’

বললাম, আপনার অনুরোধ জানানোর দরকার হলে জানাব। মনে হয় দরকার হবে না। কাগজটির নেপথ্য সম্পাদক কাজী আফসারুদ্দীন আহমদ বিখ্যাত কথাশিল্পী। তিনি সরকারি চাকরি করেন বলে নিজের নাম সম্পাদক হিসেবে দিতে পারছেন না। কুমিল্লার মহিউদ্দীন আহমদের নাম সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয়। কাজী সাহেব আমাকে খুব স্নেহ করেন। তিনি আমাকে ইনসাফের নিউজ ডেস্কে একটি চাকরি জুটিয়ে দেবেন বলেছেন।

আমার কথা শুনে মুজিব ভাই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। পাইপ টানলেন। আকস্মিকভাবে বললেন, ‘তুমি উলানিয়ার জমিদারবাড়ির আরিফ চৌধুরীকে চেনো?’

বললাম, ভালো করে চিনি। তিনি আমার আত্মীয়। এমএলএ (তখন প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের বলা হতো এমএলএ, মেম্বার অব লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি)।

মুজিব ভাই বললেন, ‘আরিফ চৌধুরী তোমার আত্মীয় হতে পারে, কিন্তু আমাকে চেনাতে হবে না। আমরা তাঁকে ডাকি আরিফ ভাই। অত্যন্ত প্রাণবন্ত লোক। গান গাইতে জানেন। কলকাতায় থাকতেই মুসলিম লীগ অঘোষিতভাবে দুই ভাগ হয়ে গেছে। একটি নাজিমুদ্দীন-আকরম খাঁ গ্রুপ, অন্যটি আবুল হাশেম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ। আমি ও আমার বয়সী যুবকরা হাশেম-সোহরাওয়ার্দী গ্রুপে ছিলাম, এখনো আছি। আরিফ ভাইও আমাদের গ্রুপে ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কথা বুঝতে আমার অসুবিধা হয়নি। অবিভক্ত বাংলাদেশে মুসলিম লীগ অঘোষিতভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, আবুল হাশেম ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা। আর খাজা নাজিমুদ্দীন ও মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের নেতা। মুসলিম লীগের অনুসরণে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগও দুই অংশে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। প্রগতিশীল অংশের নেতা শেখ মুজিব। প্রতিক্রিয়াশীল অংশের নেতা শাহ আজিজুর রহমান। অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ সরকারের শেষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

আবুল হাশেম ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী দুজনই অবিভক্ত বাংলা ভাগ হোক, পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হোক তা চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক যুক্ত বাংলা। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দুই দলের শীর্ষ নেতাদের চক্রান্তে এই যুক্ত স্বাধীন বাংলার দাবি নস্যাৎ হয়ে যায়। কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে একমাত্র নেতাজি সুভাষ বসুর বড় ভাই শরত্চন্দ্র বসু ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে স্বাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের প্রস্তাবে সায় দিয়েছিলেন।

আমি মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগের এতসব ভাঙাগড়ার কথা জানি দেখে মুজিব ভাই বিস্মিত হলেন। বললেন, ‘তুমি মফস্বলের ছাত্র হয়েও দেখছি বহু খবর রাখো। বাংলা ভাগ হওয়ার পর আমরা নতুনভাবে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেছি। নাম পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। অফিস ওল্ড মোগলটুলীতে। শাহ আজিজের নেতৃত্বে সরকার সমর্থক যে ছাত্রলীগ আছে তার নাম নিখিল পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। তুমি আমাদের ছাত্রলীগে যোগ দাও না কেন?’

বললাম, ছাত্রলীগ এখনো সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। আমি সম্প্রতি গঠিত ইয়ুথ লীগে যোগ দেব ঠিক করেছি। এটা অসাম্প্রদায়িক যুব সংগঠন। আমার কয়েকজন চেনা যুবনেতা এই দলে আছেন। যেমন— বরিশালের ইমাদুল্লা, নোয়াখালীর রুহুল আমিন কয়সর।

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার বন্ধুরাও ইয়ুথ লীগে আছেন, যেমন অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, এঁরা বামপন্থী। কমিউনিস্টদের প্রভাব এই সংগঠনে বেশি। আমাকে এই সংগঠনে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। ছাত্রলীগ নিয়ে আমি বেশি ব্যস্ত। তা ছাড়া আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছে। ব্যস্ত হয়ো না, শিগগিরই দেখবে দুটি প্রতিষ্ঠানই অসাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। এখনো অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার সময় আসেনি। ’

মুজিব ভাইয়ের মতো নেতাকে কারকুনবাড়িতে অপ্রত্যাশিতভাবে একা পেয়ে সহজে আলাপ শেষ করতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। কিন্তু তাঁর তাড়া আছে। কোথায় এক কর্মিসম্মেলনে যাবেন। আমাকে বললেন, ‘তুমি কোথায় যাবে?’

বললাম, নীলক্ষেত ব্যারাকে যাব। ওখানেই বড় ভাইয়ের সঙ্গে সাময়িকভাবে আছি।

বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি যাব ইকবাল হলে। কয়েকজন বন্ধু আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তুমি আমার সঙ্গে যাবে?’

ইকবাল হল তখন নীলক্ষেতের কাছে সলিমুল্লাহ হলের পাশে। বিভিন্ন কলেজ ও ইউনিভার্সিটির ছাত্রাবাস। কিছু সরকারি কর্মচারীও থাকেন। রাজনীতিমনা ছাত্রনেতাদের অনেকে তখন ইকবাল হলে থাকেন। হলটি ভবন নয়, একগাদা ব্যারাকের সমষ্টি।

আমি ভেবেছিলাম, মুজিব ভাইয়ের গাড়ি আছে। তিনি আমাকে লিফট দিতে চান। ইত্তেফাক অফিসের বাইরে বেরিয়ে দেখি বাড়িটার ভাঙা সিংহ দরাজার পাশে একটা সাইকেল দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো। মুজিব ভাই বললেন, ‘আমি সাইকেল চালাব। তুমি সামনে বসতে পারবে তো?’

আমার এভাবে সাইকেলে চড়ার অভ্যাস ছিল। বললাম, পারব। মুজিব ভাই তাঁর ঢোলা পাজামায় ক্লিপ লাগালেন। মাটিতে পা ঠেকিয়ে সাইকেলে চাপলেন। আমি সসংকোচে তাঁর সামনে বসলাম। একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, তিনি ব্রেক কষে সাইকেল থামান না। দীর্ঘদেহী মানুষটি তাঁর পা দিয়েই সাইকেল থামিয়ে ফেলেন। সেদিন তাঁর সাইকেলের সামনে বসে গর্বে আমার মনটা ভরে গিয়েছিল। সারা দেশের মানুষ শেখ সাহেব—এই এক নামে যাঁকে চেনে, তরুণসমাজ যাঁর কথায় ওঠে-বসে, সেই মানুষটি আমাকে তাঁর সাইকেলে চড়িয়ে ঢাকার রাজপথে তা চালাচ্ছেন।

সেদিন কি ভাবতে পেরেছিলাম, আজ যাঁর স্নেহ লাভ করেছি, যাঁর সাইকেলে চড়ে বসেছি—একদিন তিনি হবেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনক? নেতৃত্ব দেবেন ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার সংগ্রামে? আমার মুজিব ভাই হবেন অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের মহানায়কদের একজন। তা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি তখন। ভাবতে পারিনি, তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভবিষ্যতে আমি জড়িয়ে যাব ঘনিষ্ঠভাবে। তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত থাকব মুজিব অনুসারী। সে কাহিনি আরো বিচিত্র ও নাটকীয়। শেখ মুজিবের সারা জীবনটাই মহাকাব্যের নায়কের মতো ধীরোদাত্ত। আমি ব্যক্তিগতভাবে তা থেকে যেটুকু নুড়ি কুড়িয়েছি, আমার ‘বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি’ নামে প্রকাশিতব্য গ্রন্থে তা থাকবে। (সূত্র : দৈনিক কালের কন্ঠ ঈদ ফিচার-২০২১)