বিশ্বকাপ এমন একটি মঞ্চ, যেখানে কখনো কখনো স্কোরলাইন নয়, গল্পই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ! আজ আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে স্পেন ও কাবো ভের্দের ম্যাচটিও তেমন এক গল্পের সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হচ্ছে। এটি কেবল ইউরোপের এক পরাশক্তির বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করার ম্যাচ নয়; বরং ফুটবল মানচিত্রের এক ক্ষুদ্র বিন্দুর বিশ্বকে চমকে দেওয়ার স্বপ্নও।
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট কয়েকটি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা কেপ ভার্দে পৃথিবীর সেই দেশগুলোর একটি, যাদের নাম অনেকেই মানচিত্রে খুঁজে পেতে সময় নেন। জনসংখ্যা ছয় লাখেরও কম। ফুটবলের অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা তারকাখ্যাতির বিচারে তারা স্পেনের সঙ্গে তুলনারও দাবি রাখে না। কিন্তু বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই-এখানে মাঝে মাঝে সংখ্যার চেয়ে সাহস বড় হয়ে ওঠে।
আজকের ম্যাচের আরেকটি অদ্ভুত দিক হলো এর সময়। স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় শুরু হবে খেলা, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে খুবই বিরল দৃশ্য। অধিকাংশ ফুটবলার সন্ধ্যা কিংবা রাতের ম্যাচে অভ্যস্ত। ফলে শুধু কৌশল বা দক্ষতা নয়, খেলোয়াড়দের শরীরের জৈবঘড়িও আজ পরীক্ষার মুখে পড়বে। স্পেনের পুষ্টিবিদেরা বিশেষ খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি করেছেন যাতে খেলোয়াড়দের শক্তি ও মনোযোগ ঠিক থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপের ম্যাচে শেষ পর্যন্ত হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে কাজ করে আরেকটি বিষয়-মানসিকতা!
সেই মানসিকতার জায়গাতেই কাবো ভের্দে নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি খুঁজে পাচ্ছে।
অনেকের কাছে দেশটি এখনও কেপ ভার্দে নামেই বেশি পরিচিত। তবে এক দশকেরও বেশি সময় আগে দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের পর্তুগিজ নাম ‘কাবো ভের্দে’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। নামের অর্থ ‘সবুজ অন্তরীপ’। আর আজ সেই ছোট্ট দেশটি ফুটবলের সবুজ মাঠে নিজেদের পরিচয় নতুন করে লিখতে চায়!
এই যাত্রা অবশ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ২০১৫ সালে পর্তুগালকে ২-০ গোলে হারিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলোড়ন তুলেছিল তারা। সেটি ছিল সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তির বিপক্ষে এক প্রতীকী জয়। এরপর ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া। তাই আজকের ম্যাচ কাবো ভের্দের জন্য শুধু আরেকটি ম্যাচ নয়; এটি তাদের ফুটবল বিবর্তনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।
অন্যদিকে স্পেন এসেছে ভিন্ন এক পরিচয় নিয়ে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন এখন ইউরোপের অন্যতম ছন্দে থাকা দল। টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে এসেছে তারা। একসময় শুধুই পাসিং ফুটবলের জন্য পরিচিত দলটি এখন সেই শৈলীর সঙ্গে গতি, সরাসরি আক্রমণ এবং শারীরিক শক্তির মিশেল ঘটিয়েছে। রদ্রি, পেদ্রি, মিকেল মেরিনো কিংবা তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে গড়া এই দলটিকে অনেকেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে দেখছেন।
তবে স্প্যানিশ শিবিরে আত্মতুষ্টির কোনো ছাপ নেই। মিডফিল্ডার আলেক্স বায়েনার বক্তব্যেই সেটি স্পষ্ট। তার মতে, কাবো ভের্দের খেলোয়াড়রা শারীরিকভাবে ভয়ংকর শক্তিশালী এবং সামান্য অবহেলাও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। বিশ্বকাপের ইতিহাসও বারবার শিখিয়েছে, ছোট দলকে হালকাভাবে নেওয়ার মূল্য অনেক বড়। আর সেই সতর্কতার পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে।
প্রস্তুতি ম্যাচে সার্বিয়া ও বারমুডাকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এসেছে কাবো ভের্দে। দলটির ফুটবলারদের অধিকাংশই ইউরোপের আলোচিত ক্লাবে খেলেন না। অনেকেই খেলেন অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত লিগে। কিন্তু বিশ্বকাপের আগে তাদের চোখেমুখে যে আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছে, সেটি কোনোভাবেই অখ্যাতির সঙ্গে মানানসই নয়।
তরুণ ডিফেন্ডার সিডনি কাব্রালের কথাতেই ধরা পড়ে সেই মানসিকতা। তার কাছে এই ম্যাচ কোনো দর্শনভ্রমণ নয়। বরং বিশ্বকে দেখানোর সুযোগ যে কাবো ভের্দেও বড় দলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুটবল খেলতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই ম্যাচটি এত আকর্ষণীয়।
একদিকে ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন, যাদের ওপর শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা। অন্যদিকে এমন একটি দেশ, যাদের হারানোর কিছু নেই। ফুটবলে প্রায়ই দেখা যায়, সবচেয়ে বিপজ্জনক দল হয়ে ওঠে সেই দলই, যারা ভয় পায় না।
আজ আটলান্টার দুপুরে তাই শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ হবে না। এটি হবে দুই বাস্তবতার সংঘর্ষ। এক পাশে সাফল্যের ইতিহাস, অন্য পাশে স্বপ্নের ক্ষুধা। এক পাশে তারকাখচিত স্পেন, অন্য পাশে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মরিয়া কাবো ভের্দে।
ফলাফল হয়তো অনুমান করা সহজ। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, রূপকথা কখনো আগাম বলে আসে না। আর সেই কারণেই আটলান্টার এই অসম লড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্ব। হয়তো স্পেন তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে, অথবা হয়তো জন্ম নেবে বিশ্বকাপের নতুন এক বিস্ময়গাথা।





