বারবার উমরা করার লাভ

প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে পবিত্র কাবাঘর জিয়ারতের গভীর আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে। আল্লাহর ঘরকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সাঈ, ইহরামের পবিত্র আবহ এবং ইবাদতে নিমগ্ন প্রতিটি মুহূর্ত একজন বান্দাকে দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে রবের আরও কাছে নিয়ে যায়। এ কারণেই উমরা শুধু একটি সফর নয়; এটি তওবা, আত্মশুদ্ধি, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং অন্তরের প্রশান্তি অর্জনের এক মহিমান্বিত ইবাদত।

হজের নির্ধারিত সময়ের বাইরে বছরের যেকোনো সময় উমরা আদায় করা যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিক হাদিসে উমরার অসংখ্য ফজিলত, গুনাহ মাফের সুসংবাদ এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের কথা তুলে ধরেছেন। তাই সামর্থ্যবান একজন মুসলমানের জন্য উমরা হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার এক অনন্য সুযোগ।

উমরা গুনাহ মোচনের অন্যতম মাধ্যম: হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক উমরা থেকে আরেক উমরা পর্যন্ত সময়ের (সগিরা) গুনাহের জন্য কাফফারা হয়ে যায়। আর কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ -সহিহ বোখারি: ১৭৭৩

এই হাদিসে উমরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফজিলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তরিকতা, একাগ্রতা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করা উমরা বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এবং গুনাহ থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ এনে দেয়।

রমজানে উমরার বিশেষ মর্যাদা: পবিত্র রমজান মাসে উমরা আদায়ের ফজিলত অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এক নারীকে বলেছিলেন, ‘রমজান এলে তখন উমরা করে নিও। কেননা রমজানের একটি উমরা একটি হজের সমতুল্য।’ -সহিহ বোখারি: ১৭৮২
তবে এর অর্থ এই নয় যে, ফরজ হজের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। বরং সওয়াবের দিক থেকে রমজানের উমরাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।

দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করার মাধ্যম: হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ধারাবাহিকভাবে হজ ও উমরা আদায় করো। কেননা এ দু’টি আমল দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেমন হাপরের আগুন লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে।’ -জামে তিরমিজি: ৮১০

নারীদের জন্যও উমরার বিশেষ মর্যাদা: ইসলামে নারীদের জন্যও হজ ও উমরার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! নারীদের জন্যও কি জিহাদ রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাদের জন্য এমন জিহাদ রয়েছে, যাতে যুদ্ধ নেই। তা হলো হজ ও উমরা।’ -ইবনে মাজাহ ২৯০১

এই হাদিস নারীদের জন্য হজ ও উমরার বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

হজ ও উমরাকারীরা আল্লাহর মেহমান: হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হজ ও উমরা পালনকারীদের আল্লাহর বিশেষ মেহমান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী, হজকারী ও উমরাকারী আল্লাহর মেহমান। আল্লাহতায়ালা তাদের আহ্বান করেছেন, তারা তার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তারা তার কাছে প্রার্থনা করেছেন, আর তিনি তাদের তা দান করেছেন।’ -ইবনে মাজাহ: ২৮৯৩

উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে মৃত্যু হলেও রয়েছে সুসংবাদ: হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে বের হওয়া ব্যক্তির জন্যও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত হজের সওয়াব লেখা হতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়ে মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য কেয়ামত পর্যন্ত উমরার সওয়াব লেখা হতে থাকবে।’ -সহিহুত তারগিব ওয়াত তারহিব: ১১১৪

আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ: উমরা একজন মুমিনের হৃদয়কে বিনয়, ধৈর্য, তাকওয়া এবং আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ করে তোলে। ইহরামের মাধ্যমে ধনী-গরিব, শাসক-প্রজা, সাদা-কালো-সবাই একই পোশাকে এক কাতারে দাঁড়ায়। এতে ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার অপূর্ব শিক্ষা ফুটে ওঠে। এই পবিত্র সফর একজন মুসলমানকে তওবা, আত্মশুদ্ধি, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে এগিয়ে দেয়।

উমরা শুধু কাবাঘর জিয়ারতের নাম নয়, এটি একজন বান্দার অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার এক বরকতময় সফর। এ ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ নিজের অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, নতুনভাবে জীবন গড়ার অঙ্গীকার করে এবং আল্লাহর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় লাভের আশা করে।

তাই যাদের আল্লাহ তাআলা সামর্থ্য দিয়েছেন, তাদের উচিত সুযোগ পেলে এই মহান ইবাদত আদায়ে আন্তরিক হওয়া। আর যারা এখনো সেই সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি, তারা আল্লাহর কাছে বারবার দোয়া করুন- তিনি যেন তার পবিত্র ঘর জিয়ারত, তাওয়াফ এবং উমরার সৌভাগ্য নসিব করেন।

আল্লাহতায়ালা সবাইকে বারবার তার পবিত্র ঘর জিয়ারতের তাওফিক দান করুন, সবার উমরা কবুল করুন এবং এই ইবাদতের মাধ্যমে আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।