পে-স্কেলের ফাগুনে বাজারে আগুন

কথায় আছে, কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। কারো পকেটে বাজারের আগুন, কারো মনে ফাগুনের হাওয়া। জানা কথা, ফাগুনে প্রকৃতিতে লাগে নতুন রঙের ছোঁয়া। কিন্তু আজকের এই ফাগুনের আগুনে নিত্যপণ্যের বাজারে বইছে উত্তাপ।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ঘোষণা নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই বাজারে শুরু হয়েছে এক দৃশ্যমান তোড়জোড়। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে দেশের সীমিতসংখ্যক সরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়ছে, এটি নিশ্চিতভাবেই স্বস্তির খবর। কিন্তু এই খবরকে কেন্দ্র করে সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের বাজার চড়ানোর আগাম প্রবণতায় চরম উদ্বেগে পড়েছে দেশের কোটি কোটি মানুষ।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যা পে-স্কেলে নয়; মূল গলদ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। সরকার যদি দ্রুত সরবরাহব্যবস্থা জোরদার, পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ের সিন্ডিকেট দমন এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত না করে, তবে সরকারি চাকরিজীবীদের ফাগুনের সেই হাসির আলোয় সাধারণ কোটি কোটি পরিবারের রান্নাঘর আক্ষরিক অর্থেই মূল্যের আগুনে ঝলসে যাবে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদের রুখবে কে?

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি বেতন বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও এটি বেসরকারি খাতে এবং সাধারণ বাজার ব্যবস্থাপনায় তীব্র চাপ তৈরি করবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করে পে-স্কেল দিলে বাজারের দাম আরও উসকে যেতে পারে। তাই বেসরকারি খাত এবং অন্যান্য মাধ্যমেও মানুষের আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, পে-স্কেলে সরকার বৈষম্য কমানোর চেষ্টা করেছে, তবে বেতন বৃদ্ধির কারণে ‘কিছুটা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আছে’।

অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খাতে স্থবিরতার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ আয় সংগ্রহে দুর্বলতার মধ্যেই সরকার চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে নবম জাতীয় বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে। এর ফলে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করতে হতে পারে। পাশাপাশি চাপের মুখে পড়বে বেসরকারি খাতের মানুষ।

সাবেক উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বর্তমান উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের কথা ফলেছে। বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অর্থনীতিবিদ গোলাম মোয়াজ্জেমের আশঙ্কার কথাও। হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে পণ্যমূল্য।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ নয়। মূল সমস্যা সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের আগাম লাভের মানসিকতা। পাইকারি ও খুচরা বাজারের বিশাল ব্যবধান, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং বাজার সিন্ডিকেটের ওপর কার্যকর নজরদারির অভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।

কেবল খুচরা দোকানে জরিমানা করে এই ব্যাধির চিকিৎসা সম্ভব নয়; হাত দিতে হবে সরবরাহব্যবস্থার গোড়ায়। রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে বাজার ব্যবস্থাপনায়। নিশ্চিত করতে হবে, কিছু মানুষের পকেটে ফাগুনের হওয়া ঢুকতে গিয়ে যেন দেশের কোটি মানুষের পকেট সেই আগুনে ঝলসে না যায়।

তাদের মতে, একটি সরকারের সফলতা কেবল সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না। জিডিপি বা রিজার্ভের সূচক মানুষের কাছে আসল অর্থনীতি নয়; তাদের সূচক হলো চাল, ডাল, তেল ও মাছ-মাংসের দরদাম।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ুক, তা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বাড়তি আয়ের বড় অংশ যদি বাজারের পেটে চলে যায়, আর যাদের আয় বাড়েনি, তাদের ওপর চাপ যদি দ্বিগুণ হয়, তবে চূড়ান্ত বিচারে ক্ষতি সবার। সরকার পে-স্কেল দিয়েছে সরকারি কর্মচারীদের, কিন্তু বাজারকে দাম বাড়ানোর এই ছাড়পত্র দিল কে? এই কে বা কারা— তাদের আগে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল আলম বলেন, বাংলাদেশের বিপুল শ্রমশক্তি যুক্ত রয়েছে বেসরকারি চাকরি, কৃষি, দিনমজুরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক খাতে। তাদের জন্য কোনো পে-স্কেল নেই, নেই নির্দিষ্ট মেয়াদে আয় বাড়ার নিশ্চয়তা। অথচ বাজারে গেলে সরকারি কর্মকর্তা, পোশাকশ্রমিক, দোকানকর্মী কিংবা দিনমজুর, সবাইকে একই মূল্যে চাল, ডাল, তেল ও সবজি কিনতে হয়। এই জায়গাতেই জন্ম নেয় বৈষম্য। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আয় বাড়াকে অজুহাত বানিয়ে যদি বাজারের সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তবে তার পুরোটাই বহন করতে হয় সেই কোটি মানুষকে, যাদের আয় বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির এই যুগে। বুঝতে হবে যে এই সমস্যাটা পে-স্কেলে নয়। সমস্যাটি পে-স্কেলের অজুহাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও আগাম মূল্যবৃদ্ধিতে। নতুন পে-স্কেল ঘোষণা কি খেতে সবজি উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে? ডাল আমদানির ব্যয় বা পরিবহন খরচ বাড়িয়েছে? যদি তা না হয়, তবে পে-স্কেলের নামে চাল-তেলের দাম বাড়ার যুক্তি কোথায়?

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা আফসানা হক বলেন, কারো বেতন বাড়লে সেটাতে নাখোশ হওয়ার কিছু নেই; বরং সেটা আনন্দের। কিন্তু এই অজুহাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে। মাসের সীমিত আয় থেকে ঘরভাড়া, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচ মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়েই চলে জীবনসংগ্রাম। সেখানে যখন বাজারে আগুন লাগে, তখন বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করতে হয় খাবারের থালায়। পুষ্টিকর খাবার বাদ পড়ে, চিকিৎসা পিছিয়ে যায়, কমে আসে জীবনযাত্রার মান।

এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সেই সাধারণ কোটি মানুষের আকুল প্রশ্ন, আমাদের বেতন কে বাড়াবে?

নতুন পে-স্কেল ঘোষণার অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ানো হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) আহ্বায়ক মো. ফজলুল হক।

তিনি বলেন, পে-স্কেল অনুমোদনের পর নিত্যপণ্যের দামে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। পে-স্কেলের সঙ্গে যে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো সংযোগ নেই, বিষয়টি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে এবং দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। পে-স্কেল ঘোষণার পর ব্যবসায়ীরা যদি জিনিসপত্রের দাম ২-৪ টাকা বাড়িয়ে দেন, এতে সরকারি চাকরিজীবীদের গায়ে হয়তো লাগবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষ ভুক্তভোগী হবে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা সভায় বাজার পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সুপারিশ করেছেন। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোথায় কোথায় কাজ করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী নেতা হাজি হাসমত উল্লাহ বলেন, চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, আটা, ময়দাসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ঠিক রাখা গেলে মূল্য বৃদ্ধি পাবে না। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ দরকার। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেই তারা স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছেন। তবে সিন্ডিকেট করে কিছু ব্যবসায়ী বাজারে পণ্যের দান বাড়াচ্ছেন বা বাড়ানোর অপচেষ্টা করছেন।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, আমদানি এবং মিল পর্যায়ে উৎপাদন সচল না রাখা গেলে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা যাবে না। এ জন্য জ্বালানি সংকট নিরসন এবং এলসি-সংক্রান্ত জটিলতার দ্রুত সমাধান করতে হবে।

কারওয়ান বাজার কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফুটপাতের হকার এবং অনিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের তদারকির আওতায় আনা দরকার।

নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহব্যবস্থায় পণ্যের হাতবদল কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে হয়রানি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ দরকার। না হলে পণ্যমূল্য কমবে না। পাশাপাশি, খুচরা ও পাইকারি বাজারসহ মিলগেটে পণ্যের মূল্য তদারকি জোরদার করতে হবে বলেও জানান তিনি।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যে রাখতে চাইলে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বেসরকারি খাতকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।