রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশু নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়ে পুলিশি অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন নিখোঁজ শিশুদের স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে জিডি নিতে গড়িমসি করা হয়। জিডি নেওয়ার পরও শিশুকে উদ্ধারে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত তৎপরতা দেখা যায় না।
রোববার রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সামাজিক সংগঠন মুন এলার্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন নিখোঁজ শিশুদের অভিভাবক ও স্বজনেরা। এতে অন্তত ৩৫টি ভুক্তভোগী পরিবার অংশ নেয়। বক্তব্য দেওয়ার সময় অনেক স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সন্তানদের দ্রুত উদ্ধারে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিজের চার বছরের মেয়ে সাইবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন বিথী আক্তার। তাঁর ভাষ্য, গত ৩০ আগস্ট বনানী সৈনিক ক্লাবের সামনে মেয়েকে নিয়ে জুতা কিনতে গিয়েছিলেন তিনি। ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় শিশুটিকে দাঁড় করিয়ে পাশের ফুটপাতে জুতা কেনার সময় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে সাইবা নিখোঁজ হয়ে যায়।
বিথী আক্তারের অভিযোগ, ঘটনার দিন বনানী থানায় গিয়ে জিডি করতে চাইলে পুলিশ তাঁকে আগে নিজেরাই শিশুকে খুঁজে দেখতে বলে। অভিযোগ না নিয়ে তাঁকে ধমক দিয়ে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরদিনও একই ধরনের আচরণের শিকার হন তিনি। পরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আবার থানায় গেলে জিডি নেওয়া হয়।
সাইবার নানী শরীফা বেগম জানান, ৩০ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে শিশুটি নিখোঁজ হলেও বনানী থানা জিডি নেয় ১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে।
তাঁর অভিযোগ, জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁকে আলাদাভাবে ডেকে বলেন, শিশুকে খুঁজে বের করা পুলিশের কাজ নয়; তাঁরা নিজেরা খোঁজ পেলে পুলিশকে জানালে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করবে।
তবে পুলিশের গণমাধ্যম শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা রয়েছে। জিডি নিতে অনীহা বা অসহযোগিতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শিশু উদ্ধারে জিডি নেওয়াই পুলিশের একমাত্র দায়িত্ব নয়, শিশুকে উদ্ধার করাও পুলিশের দায়িত্ব। কোনো কর্মকর্তা নিখোঁজ শিশুর স্বজনকে নিজেরা খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়ে থাকলে তিনি ঠিক কাজ করেননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনলাইন জিডির ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। অনলাইনে জিডি গ্রহণে বিলম্বের সুযোগ নেই।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় এ সময়ে ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনো নিখোঁজ। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হলেও ১ হাজার ৯৭০ জন এখনো নিখোঁজ।
সংবাদ সম্মেলনে সাইবার নানী শরীফা বেগম আরও অভিযোগ করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁদের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উল্লেখ করে স্থানীয় কোনো প্রভাবশালী নেতার সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, জিডি করার পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি।
অভিযোগের বিষয়ে বনানী থানার সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, জিডির কপি পাওয়ার পরপরই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে সেখানে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় ফুটেজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর দাবি, পুলিশের পক্ষ থেকে করণীয় অনুযায়ী চেষ্টা করা হচ্ছে।
একেক পরিবার, একই অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে একের পর এক নিখোঁজ শিশুর স্বজন পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসি ও অসহযোগিতার অভিযোগ করেন। তাঁদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা আলাদা হলেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ প্রায় একই।
খুলনার কয়রা থেকে আসা বিলকিস বেগম জানান, গত বছরের ২৬ আগস্ট বাজার থেকে তাঁর মেয়ে সামিরা নিখোঁজ হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, আজমির নামের ১৯ বছর বয়সী এক যুবক শিশুটিকে ভ্যানে বসিয়ে মিষ্টি কিনে খাইয়েছিল।
বিলকিসের দাবি, স্থানীয়দের চাপের মুখে কয়রা থানা পুলিশ আজমিরকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটিকে চেনার কথা স্বীকার করলেও তাকে গ্রেপ্তার না করে জিডি করে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে সামিরার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বিলকিসের অভিযোগ, ঘটনার শুরুতেই পুলিশ কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁর মেয়েকে উদ্ধারের সম্ভাবনা ছিল।
মিরপুরের নিখোঁজ শিশু ইব্রাহিমের বাবা মোহাম্মদ জসিমও পুলিশের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, গত ১৩ মে ছেলে বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর পল্লবী থানায় প্রথমে জিডি নেওয়া হয়নি। দুই দিন পর জিডি নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় তাঁকে ঘোরানো হয়েছে। পরে মামলা নিয়ে তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে দেওয়া হয়।
ফুচকা বিক্রি করে সংসার চালানো জসিম বলেন, সন্তান হারানোর পর দিনের পর দিন থানায় ঘুরেছেন। কিন্তু পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। সন্তানকে ফিরে পেতে তিনি সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করেন।
রাজবাড়ী থেকে আসা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য মো. নজরুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২০ মে তাঁর একমাত্র সন্তান তামিম নিখোঁজ হয়। ১৬ মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেও তিনি সন্তানের সন্ধান পাননি।
নজরুল ইসলামের অভিযোগ, পুলিশের সাবেক সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তিনি পুলিশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে নিজের অবসরকালীন সঞ্চয়ের বড় অংশও ব্যয় করেছেন বলে জানান তিনি।
মুন এলার্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির কার্যক্রম শুরুর পর থেকে শিশু নিখোঁজের ১ হাজার ২২৬টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে পুলিশের সহযোগিতায় আট শতাধিক শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ১৭১টি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে এবং সতর্কবার্তা জারির পর ১১৯ শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী সাদাত রহমান বলেন, উন্নত দেশগুলোতে শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, বাংলাদেশেও তেমন কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি নেওয়া থেকে শুরু করে উদ্ধার পর্যন্ত সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।





