বিশ্বজুড়ে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম, আর তার তীব্র উত্তাপে এখন ফুটছে পুরো পৃথিবী! মার্কিন-ইরান যুদ্ধের মারাত্মক আঁচে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে চরম জ্বালানি সংকট। তেল চড়া দামে কিনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট খালি, আর সেই তীব্র ক্ষোভের আগুনে এখন জ্বলছে একের পর এক দেশ।
সম্প্রতি উপসাগরে ইরানি তেল ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলা এবং ইয়েমেনে ফের লড়াই শুরু হওয়ায় বাবেল মান্দেব প্রণালিতে নৌচলাচল চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এর জের ধরে গত সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আর এই সংকটের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের আকাশছোঁয়া দাম আর শীতকালীন হিটিং অয়েলের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাসে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। তবে তুলনামূলক কম ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ একেবারেই ভেঙে গেছে। জ্বালানির চড়া দাম সাধারণ মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জরুরি সেবাকে পুরোপুরি থমকে দিয়েছে, যা জনগণকে ঠেলে দিয়েছে রাজপথে।
সিরিয়ার ইদলিবে বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে পুরো পথ অচল করে দিয়েছে। সিরিয়ায় গত দুই বছর আগে আসাদ সরকারের পতনের পর এটাই সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ। সম্প্রতি সরকার ডিজেল ও গ্যাসের দাম অবিশ্বাস্য হারে বাড়ায় পুরো দেশ জুড়ে অসন্তোষের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। দাম কমানোর দাবিতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আলেপ্পোর বিক্ষোভস্থলে এক বিক্ষোভকারী ইয়াদের সালিম চিৎকার করে বলছিলেন, এখানে উপস্থিত সবাই আমরা ডিজেলের দাম কমানো চাই। আমরা অতিরিক্ত মজুরি চাই না, আমরা শুধু সস্তায় জ্বালানি চাই! আরেক ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারী বাসাম আল-আলি সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, আমরা কোনো নতুন গোলচত্বর বা ঝলমলে শপিংমল চাই না। আপনারা প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার খরচ করে এসব বানাচ্ছেন, অথচ জনগণ কী অবস্থায় আছে দেখছেন না? আপনার জনগণ আপনার সাথেই ছিল এবং থাকবে, কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুরো পরিস্থিতিকে বিস্ফোরণের মুখে ঠেলে দেবে! বৈশ্বিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘অ্যাকলেড’-এর বিশ্লেষক মুয়াজ আল আবদুল্লাহ জানান, তেলের ঘাটতি, দাম বৃদ্ধি আর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে মানুষের মনের ক্ষোভ এখন পুরো সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে। মানুষ এখন জ্বালানি মন্ত্রীর পদত্যাগসহ নীতি পরিবর্তনের দাবি তুলছে।
একই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে মধ্য আমেরিকাতেও। গুয়াতেমালায় পরিবহন ধর্মঘট ও সড়ক অবরোধে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিক্ষোভকারীরা চালকদের জীবনযাত্রা সচল রাখতে অবিলম্বে সরকারি ভর্তুকির দাবি জানিয়েছেন। সেখানকার কংগ্রেসের সভাপতি লুইস কনট্রেয়াস কোলিন্ড্রেস সামগ্রিক সংকটের গভীরতা তুলে ধরে সরাসরি বলেছেন, এই সমস্যাটি পুরো দেশকে একসাথে সমাধান করতে হবে। নির্বাহী, আইনসভা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এতে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ মানুষ এত বেশি দাম দিয়ে তেল কিনতে পারছে না, তাদের ব্যক্তিগত অর্থনীতিতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ডিজেলই হলো এই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
ইউরোপের পরিস্থিতিও বেশ উত্তপ্ত। পর্তুগালের এস্পিনহো শহরের রাজপথে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা নেমে এসেছেন বিশ্বজোড়া মূল্যস্ফীতি ও তেলের দামের প্রতিবাদে। বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল নিয়ে সোজা দেশটির প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনিগ্রোর বাসভবনের সামনে গিয়ে জোর প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে পর্তুগিজ দমকল বাহিনী আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছে, জ্বালানির এই অগ্নিমূল্যের কারণে স্বেচ্ছাসেবীদের পক্ষে ফায়ার সার্ভিস পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে বাস, ট্যাক্সি ও জরুরি সেবার জন্য বিশেষ সহায়তার ঘোষণা দিতে হয়েছে।
ফ্রান্সেও দেখা গেছে একই অশান্ত দৃশ্য। দক্ষিণ ফ্রান্সের ফোস-সুর-মের অঞ্চলে প্রায় ৫০ জন জেলে একত্রিত হয়ে ডিপো অবরুদ্ধ করে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেন, যার ফলে পুলিশের সাথে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এলাকার মেয়র ফিলিপ মরিজোট রাজ্য সরকারের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের আকুতি জানিয়ে চিঠিতে লিখেছেন, তেলের বাড়তি দাম, একের পর এক বিধিনিষেধ আর পর্যাপ্ত আয়ের অভাবে আমাদের মৎস্যজীবীরা আজ এক চূড়ান্ত অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। তাদের এই ক্ষোভ ও আর্তনাদ সরকারকে অবশ্যই শুনতে হবে।
এদিকে, এশিয়ার ফিলিপাইনেও অবস্থা করুণ। পরিবহন সংগঠন মানিবেলার কর্মীরা দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। তেলের ওপর অতিরিক্ত কর প্রত্যাহার এবং ভর্তুকির দাবিতে তারা সরব হয়েছেন। ফিলিপাইনের জ্বালানি সচিব শ্যারন এস গ্যারিন পরিস্থিতি অনুধাবন করে বলেছেন, পাম্পে তেলের দাম বাড়লে তা শুধু গাড়ি ভরার খরচ বাড়ায় না। এটি প্রতিটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন বাজেট, চালকদের জীবিকা এবং ব্যবসার পরিচালনা খরচকে মারাত্মকভাবে আঘাত করে। যুদ্ধের শুরু থেকেই ফিলিপাইনের মানুষ তীব্র ভোগান্তিতে আছে। দেশটির ট্রেড ইউনিয়ন নেতা জেরোম অ্যাডোনিস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ইরানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো উচিত। এই তেল সংকটের প্রভাব আমাদের সবাইকে ভোগাচ্ছে। আমাদের দেশে হয়তো সরাসরি বোমা পড়ছে না কিন্তু তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমরা দারিদ্র্য আর ক্ষুধার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি!
সূত্র: সিএনএন





