উপসাগরে শেষ হচ্ছে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য? চীনের চালে দিশেহারা ওয়াশিংটন!

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দেশটির এ বছরের কূটনৈতিক তৎপরতায়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও জর্ডানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এ বছর চীন সফর করেছেন। 

এরই ধারাবাহিকতায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির সাম্প্রতিক চীন সফর এবং এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেইজিং সফর উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হলেও বর্তমানে এই অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতার অর্থ এই নয় যে, চীন উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করতে চাইছে। বরং চীন বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর মাধ্যমে অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করছে—যা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মডেল অনুসরণে আগ্রহী নয় চীন
উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহিরাগত সামরিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্রব্যবস্থা, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক ঘাঁটি ও উপস্থিতির কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরে চীনের প্রভাবকে নিজের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করে আসছে। সামরিক উপস্থিতি, নৌ সক্ষমতা বা নিরাপত্তা জোটের বিচারে চীন এখনও যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হওয়ার কাছাকাছি নেই। কিন্তু কেবল সামরিক সক্ষমতার মাপকাঠিতে চীনের কৌশলগত প্রভাব পরিমাপ করাকে সঠিক পদ্ধতি বলে মনে করছে না বিশ্লেষণধর্মী এই দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ খুব সীমিত। বরং ওয়াশিংটনের তৈরি নিরাপত্তা কাঠামো থেকেই দীর্ঘদিন ধরে চীন অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে আসছে।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো নিরাপদ রাখতে ভূমিকা রেখেছে। এই নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পরিবেশ চীনা কোম্পানিগুলোকে উপসাগরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জ্বালানি কেনার সুযোগ করে দিয়েছে।

চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যবস্থায় খরচ তুলনামূলক কম, কিন্তু লাভ অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জায়গা নিতে গেলে চীনকে উপসাগরের নিরাপত্তার প্রধান গ্যারান্টর হিসেবে রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামরিক দায়িত্ব নিতে হবে। বেইজিংয়ের জন্য এমন দায়িত্ব নেওয়া খুব একটা লাভজনক নয়। তাই চীন ভিন্ন পথে এগোচ্ছে। সামরিক শক্তির বদলে অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরির এমন ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় অর্থনীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর করা সম্ভব।

বন্দর থেকে প্রযুক্তি—বাড়ছে চীনা অংশীদারত্ব
উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতেও চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে। এর একটি উদাহরণ হলো চায়না কসকো শিপিং পোর্টস। প্রতিষ্ঠানটি আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনাল পরিচালনাকারী যৌথ উদ্যোগে নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার।

শুধু বন্দর নয়, ভবিষ্যতের উপসাগরীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতেও চীনা কোম্পানির সম্পৃক্ততা বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে- নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, উৎপাদন, লজিস্টিকস, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ডিজিটাল অবকাঠামো।

বিনিয়োগ, অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে এসব খাত যখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসার অর্থনৈতিক ব্যয়ও বাড়ে। একটি বিমানবাহী রণতরী কোনও অঞ্চল থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব, সেনা মোতায়েনও কমানো যায়। কিন্তু বন্দর, কারখানা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব সহজে প্রত্যাহার করা যায় না।

এভাবেই চীন এমন এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করছে, যা সরাসরি রাজনৈতিক আনুগত্য দাবি করে না। উপসাগরীয় দেশগুলোকে চীনপন্থী হয়ে উঠতে হবে—এমন কোনও শর্তও নেই। বরং বেইজিংয়ের কৌশল হলো, চীনবিরোধী অবস্থান যেন এসব দেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে উপসাগরীয় দেশগুলো
উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে কোনও মৌলিক বিরোধ নেই। সৌদি আরব, আমিরাত এবং কাতার—তিন দেশই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও উন্নত পশ্চিমা প্রযুক্তি চায়। একই সঙ্গে তারা চীনের বিশাল বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং এশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সুবিধাও নিতে চায়।

এই দেশগুলোর মূল লক্ষ্য কোনও একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া। অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে তারা ক্রমবর্ধমান বহুমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে চাইছে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়া এই কৌশলের গুরুত্ব আরও সামনে এনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোও হামলার মুখে পড়েছে, যার মধ্যে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিও রয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দেখিয়েছে, একটি মাত্র নিরাপত্তা অংশীদার, একটি রফতানি বাজার, একটি নৌপথ, একটি প্রযুক্তিব্যবস্থা কিংবা একটি মূলধনের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কোনও দেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে বৈচিত্র্যকরণ এখন কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও অংশ। তারা এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু অর্থনীতি, রাজনীতি ও প্রযুক্তিতে প্রভাব বিস্তারের একমাত্র উৎস হিসেবে ওয়াশিংটন থাকবে না।

তেলের বাইরে অর্থনীতি গড়ার চেষ্টা
উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈচিত্র্যকরণ কেবল নিরাপত্তা বা কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরব, আমিরাত, কাতারসহ বিভিন্ন দেশ তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতির বাইরে নতুন শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), উন্নত উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং লজিস্টিকস এখন এসব দেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
এআই খাত এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবের হিউম্যাইন এবং আমিরাতের জি৪২-এর মতো উদ্যোগ দেশ দুটির এআইভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তবে এআই শিল্প গড়ে তুলতে শুধু সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি কোম্পানি যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার, বিপুল বিদ্যুৎ সরবরাহ, কম্পিউটিং অবকাঠামো, মূলধন এবং দক্ষ জনবল।
এই কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা প্রযুক্তি, অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং শিল্প সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

সামরিক উপস্থিতিই একমাত্র ক্ষমতার মাপকাঠি নয়
এই বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত প্রভাব পরিমাপের পদ্ধতিও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কোনও অঞ্চলে একটি দেশের কতটি সামরিক ঘাঁটি আছে—ভবিষ্যতে সেটিই হয়তো তার প্রভাবের একমাত্র বা প্রধান মাপকাঠি হবে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, কোনও দেশের প্রভাবকে আঞ্চলিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন।
উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি অত্যন্ত গভীর। প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং কূটনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের সঙ্গে বহুস্তরীয়ভাবে যুক্ত।

অন্যদিকে চীন ভিন্ন ধরনের একীভূত সম্পর্ক তৈরি করছে। বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তীতে বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে প্রভাব বা ‘লিভারেজ’-এ রূপ নিতে পারে।

চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার পথে যুক্তরাষ্ট্র
এ অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চনের মধ্যে যেকোনও একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা ওয়াশিংটনের জন্য কার্যকর কৌশল নাও হতে পারে। বরং প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, টেলিযোগাযোগ, সংবেদনশীল তথ্য এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

তবে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিযোগিতার আরেকটি পথও খোলা রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি, বিশ্বাসযোগ্য অর্থায়ন এবং গভীর শিল্প অংশীদারত্বের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক রূপান্তরে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ওয়াশিংটন। অর্থাৎ, উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়ে প্রতিটি অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত খাতে আধিপত্য ধরে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।

চীনের কৌশলও যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গা নেওয়া নয়। বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বাণিজ্যের মাধ্যমে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা, যার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের একক আধিপত্যের লড়াইয়ের চেয়ে বেশি হবে বহুমুখী অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ এবং কৌশলগত ভারসাম্যের গল্প। আর এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সামরিক শক্তির পাশাপাশি বন্দর, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা ও শিল্প অংশীদারত্বও হয়ে উঠছে ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সূত্র: আল-জাজিরা