হরমুজে ইরানের ‘কালো তালিকায়’ ৭৭ জাহাজ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। দেশটির পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ হরমুজ প্রণালির নিয়ম ও প্রটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগে ৭৭টি জাহাজের একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকাভুক্ত এসব জাহাজ ভবিষ্যতে প্রণালিটি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারে।

ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট অনুরোধ ব্যবস্থাপনার জন্য গঠিত এই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে জরিমানা, আটক কিংবা জাহাজ জব্দ করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্ধারিত নিয়ম ও প্রটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগে এসব জাহাজকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা করছে—এমন বাণিজ্যিক জাহাজকেও ভবিষ্যতে এই তালিকায় যুক্ত করা হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবির সঙ্গে ইরানের বিরোধ
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বিরোধ রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।

তবে ইরান বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তেহরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে দাবি করছে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালি খুলবে না ইরান
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বিরোধের অবসান এবং নিজেদের কয়েকটি দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার প্রশ্নে তারা সম্মত নয়।

তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ, যুদ্ধ বা ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এসব বিষয়ে সমাধান না হলে প্রণালিটি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু না করার বিষয়ে ইরান অনড় অবস্থানে রয়েছে।

নতুন করে ৭৭টি জাহাজের তালিকা প্রকাশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত করার হুমকি সেই অবস্থানকেই আরও স্পষ্ট করেছে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রফতানির বড় একটি এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যায়। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাহাজকে জরিমানা, আটক বা জব্দ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে জাহাজ মালিক, আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানের সর্বশেষ পদক্ষেপ তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বের অংশ নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় নতুন মাত্রা
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা এমন এক সময়ে নতুন মাত্রা পেল, যখন প্রণালিটির ভবিষ্যৎ নিয়েই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে ওয়াশিংটন জলপথটির ওপর নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে, অন্যদিকে তেহরান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের শর্তে প্রণালির কার্যক্রম পরিচালনার অবস্থান নিয়েছে।

৭৭টি জাহাজের নতুন তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে ইরান কার্যত জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে নিজেদের নির্ধারিত নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে তারা প্রস্তুত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতাকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার সতর্কবার্তা ভবিষ্যতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা