পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে রাজধানীতে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে ৫ দিনের কুরবানির পশুর হাট। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবার মোট ২৭টি স্থানে কুরবানির পশুর হাট বসানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। আজ থেকেই পুরোপুরি জমে উঠবে গরুর হাট।
তবে নিয়ম ভঙ্গ করে কোনো কোনো হাটে পশু কেনাবেচা আগেই শুরু হয়ে গেছে। যদিও এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি কেনাবেচা। হাটে অনেক পশু থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। অবশ্য দুই-তিন দিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নদী ও সড়কপথে রাজধানীতে আসতে শুরু করে কুরবানির পশু। হাটে শুধু গরু নয়, উট, মহিষ, ছাগল ও ভেড়াও রয়েছে। তবে অধিকাংশ হাট সড়কঘেঁষা বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে তীব্র যানজট, জনভোগান্তি ও পরিবেশ দূষণের আশঙ্কাও রয়েছে।
ডিএসসিসি এবং ডিএনসিসি বলেছে, কুরবানির পশুর হাট নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ৫ দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে আজ থেকে। যদিও গত বৃহস্পতিবার থেকেই প্রস্তুতিমূলক হাট বসা শুরু হয়েছে। কুরবানির পশু কেনাবেচা ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১০০ কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবেন। পশু বিক্রির অর্থ থেকে ইজারাদারকে ৫ শতাংশ হাসিল দিতে হবে। এর বাইরে গরু বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি হাটের প্রতিদিনের বর্জ্য প্রতিদিনই নির্ধারিত স্থানে সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না হয়। হাটগুলোতে নিরাপত্তা, বর্জ্য অপসারণ, অস্থায়ী শৌচাগার, পানি ও আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পশুর হাটে জাল টাকা শনাক্তকরণ টিম, ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে।
অন্যদিকে আজ বিকাল ৪টায় পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দিয়াবাড়ী (উত্তরা ১৬ নম্বর সেক্টর) কুরবানির পশুর হাট পরিদর্শন করবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ডিএসসিসির ১১টি অস্থায়ী হাটগুলো হলো- পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ের খালি জায়গা, উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গা, রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গা, আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গা এবং শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ডের খালি জায়গা। এ ছাড়া আফতাবনগর (ইস্টার্ন হাউজিং) ব্লক-ই, এফ, জি, এইচ, সেকশন-১ ও ২-এর খালি জায়গা, শিকদার মেডিকেলসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গা, কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পানির পাম্পসংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত জায়গা, দয়াগঞ্জ রেলক্রসিং থেকে জুরাইন রেলক্রসিং পর্যন্ত রাস্তার খালি জায়গা, মোস্তমাঝি মোড়সংলগ্ন বনশ্রী হাউজিংয়ের খালি জায়গা, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশের খালি জায়গা এবং গোলাপবাগ আউটার স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের খালি জায়গায়ও কুরবানির পশুর হাট বসবে। ডিএনসিসির ১৬টি হাটের মধ্যে রয়েছে গাবতলী স্থায়ী পশুর হাট।
আর অস্থায়ী হাটগুলো হলো- মিরপুর সেকশন-৬ (ইস্টার্ন হাউজিং) এলাকা, মিরপুর কালশী বালুর মাঠের ১৬ বিঘা খালি জায়গা, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসংলগ্ন এলাকা, মেরুল বাড্ডা কাঁচা বাজারসংলগ্ন খালি জায়গায় এবং পূর্ব হাজীপাড়ায় ইকরা মাদরাসার পাশের খালি জায়গা। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরের বসিলায় ৪০ ফুট রাস্তাসংলগ্ন খালি জায়গায়, উত্তরা দিয়াবাড়ীর ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকায়, ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদরাসা থেকে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউসংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা সুইসগেট পর্যন্ত এলাকা, কাঁচকুড়া বাজারসংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকা, মস্তুল চেকপোস্টসংলগ্ন পশ্চিম পাড়া, ভাটারা সুতিভোলা খালসংলগ্ন খালি জায়গা, বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গা, মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠের জায়গা, বাড্ডা থানার স্বদেশ প্রপাটিরও খালি জায়গা এবং বড় বেরাইদ বসুন্ধরা গ্রুপের খালি জায়গায় পশুর হাট বসবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় গরু না আসায় এবার দেশীয় পশুর চাহিদা বেশি। ভালো দামের আশা করছি। ইতিমধ্যে উত্তরাঞ্চল, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক গরু রাজধানীতে এসেছে। ঈদের আগের দিন পর্যন্ত গরু আসবে। এখন সবাই হাটকেন্দ্রিক ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে খামারি, সাধারণ চাষি ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গবাদিপশু নিয়ে আসতে গিয়ে কোথাও কোথাও বিড়ম্বনারও শিকার হচ্ছেন। তারপরেও আজ থেকে রাজধানীর পশুর হাটগুলো পুরোপুরি জমজমাট হয়ে উঠবে বলে আশা করছি।
দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, রাজধানীর স্থায়ী হাটের পাশাপাশি অস্থায়ী হাটগুলোতেও আজ থেকেই পশু আসতে শুরু করবে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি গরু, ছাগল ও মহিষ ঢাকায় প্রবেশ করায় রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে চাপ বাড়বে কয়েকগুণ। বিশেষ করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, টঙ্গী-আব্দুল্লাহপুর এলাকা, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ অংশে দীর্ঘ যানজটের শঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সংস্থা দুটি ও ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা কাজ করবেন।
পশুবাহী ট্রাক সাধারণত রাতে ঢাকায় প্রবেশ করলেও দিনে এসব ট্রাক সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। অনেক সময় হাটের জায়গা সংকটের কারণে ট্রাক রাস্তার ওপরই সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। এতে সড়কের একাধিক লেন বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া ক্রেতাদের ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও ভ্যানের অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কুরবানির পশুর হাট কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
ডিএমপি বলছে, কুরবানির পশুর হাট কেন্দ্র করে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন, পশুবাহী গাড়ির সময় নির্ধারণ ও বিকল্প সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনগুলোতে তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেরও ট্রাফিক বিভাগ কাজ করবে। একই সঙ্গে পশুর হাট কেন্দ্র করে জাল টাকা, ছিনতাই, মলমপার্টি ও চাঁদাবাজি ঠেকাতে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মাঠে কাজ শুরু করেছেন। হাট এলাকায় অস্থায়ী পুলিশ কন্ট্রোল রুম, সিসি ক্যামেরা ও নজরদারি টিম মোতায়েন করা হয়েছে।
খামারিরা বলছেন, খাবারের দাম ও পরিবহনব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। আমাদের নিজেদেরই বাঁশ পুঁততে হচ্ছে। বাজারে বিশৃঙ্খলা আছে। একটা খুঁটি গাড়তে হাট মালিককে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। তাই নিজেরাই শাবল দিয়ে বাঁশ গেড়ে বেঁধে দিচ্ছি। তবে শেষ মুহূর্তে ক্রেতারা আসলে বাজার আরও চাঙ্গা হবে।
অন্যদিকে কমলাপুরে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের মাঠ ও আশপাশের সড়কে বসেছে গরু-ছাগলের বিশাল হাট। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বেপারি ও খামারিরা গরু-ছাগল নিয়ে ক্রেতাদের অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ কেউ খুঁটি গেড়ে পশু বাঁধার জায়গা তৈরি করছেন। দলবেঁধে আসা ক্রেতারা ঘুরে দেখছেন বিভিন্ন জাতের গরু, ছাগল ও মহিষ। তবে অধিকাংশ ক্রেতাই পশু দেখে, দাম জিগ্যেস করে আবার ফিরে যাচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছেন বেপারি রহিম মিয়া। তিনি বলেন, কুরবানির পশু নিয়ে এসেছি। এর মধ্যে যা বিক্রি হয়। মূল বিক্রি শুরু হবে ২৫, ২৬ ও ২৭ মে রাতে। এখন দুয়েকজন করে ক্রেতা আসছেন। তারা গরু দেখছেন। দাম জিগ্যেস করে চলে যাচ্ছেন। তবে এই কয়দিন গরুকে খাবারসহ রাখা অনেক কঠিন। এ ছাড়া খাবারের দামও বেশি। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কেমন হয়। তাই ২৭ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করি।
উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গায় গরুর হাট বসেছে। এ হাটে কুরবানির পশু নিয়ে এসেছেন রবিউল। তিনি বলেন, ক্রেতারা আসছেন। গরু দেখছেন। দরদাম করছেন। যেহেতু দেশে ভারতীয় গরু আসেনি, তাই ভালো দাম পাওয়ার আশা করা যাচ্ছে। এ হাটে খিলগাঁও থেকে গরু দেখতে এসেছেন সোহান।
তিনি বলেন, আজকে দেখতে আসলাম। কেমন গরু আসছে খোঁজখবর নিলাম। দামটা কেমন জানার চেষ্টা করলাম। যেহেতু সবই দেশি খামারের গরু। তাই দেশি গরুর দাম মনে হয় একটু বেশিই হবে। দেখে-শুনে পরে নিয়ে যাব। ঈদের দুই-তিন দিন আগে কিনলে বাচ্চারা গরুকে খাওয়াতে পারে, সময় কাটাতে পারে। কুরবানির ঈদের আনন্দই এটা। দেখা যাক। ভালো পেলে নেব। না হলে তো ২৭ মে রাত পর্যন্ত সময় আছে।
কুরবানির পশুর হাটে ক্রেতাদের নজর কাড়ছে মহিষ। নাটোর থেকে মহিষ নিয়ে এসেছেন খামারি সাজেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমার সবগুলো মহিষ সুন্দর। প্রতিটি মহিষের আলাদা নাম রয়েছে। মহিষগুলোর দাম হাঁকা হয়েছে ২ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে ডিএসসিসির ১১টি পশুর হাট বসানো হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতা এবং নগরবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা ও সুবিধার্থে প্রতিটি হাটে কন্ট্রোল রুম বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হচ্ছে। গবাদিপশু ও মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিটি হাটে মেডিকেল টিম নিয়োজিত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় নিয়োজিত থাকবে পুলিশের বিশেষ টহল। একই সঙ্গে হাট ও কুরবানির বর্জ্য অপসারণে ইজারাদারদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডিএসসিসি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো শফিকুল ইসলাম বলেন, কুরবানির পশুর হাটের জন্য যাতে কোনো ধরনের যানজট সৃষ্টি ও বিশৃঙ্খলা না হয়, সে ক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগ কাজ করছে। ইতিমধ্যে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে কয়েকবার যৌথ সভার মাধ্যমে পশুর হাট ইজারাদারদের সমন্বয়ে নির্দেশিত শর্তের আলোকেই এ বছর কুরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় হবে। তারা ছোট ছোট ট্রাকে পশু নামাবে এবং প্রধান সড়কে দাঁড়াবে না। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।





