শঙ্কা বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু

বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের ছয় মাসে যে পরিমাণ রোগী আক্রান্ত হয়েছেন তার চেয়ে জুলাইতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এডিস মশার কামড়ে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই উদ্যোগ না নিলে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ অনেক জায়গায় মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো জনবল, যন্ত্র ও বাজেট নেই। তাই স্থানীয় সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত বাজেট, যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার বাইরে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী বাড়তে শুরু করেছে। এই এলাকাগুলো এডিস মশার হটস্পট হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮১ জন।

চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ২০১ জন, মারা গেছেন ৩৯ জন। এর মধ্যে শুধু জুলাইতেই আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৯৭ জন, মারা গেছেন ২১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে বরিশাল বিভাগের ২ হাজার ৮২০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ২ হাজার ১১৭ জন, ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১ হাজার ৫৬৭ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১ হাজার ১৯৪ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১ হাজার ৭৪৭ জন ও খুলনায় ১ হাজার ৫৯৫ জন।

ময়মনসিংহে ৪৮১ জন, রাজশাহীতে ৩৮৬ জন, রংপুরে ২০৭ জন ও সিলেটে ৮৭ জন। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তদের ভিড়। বর্তমানে রাজধানীর ১৮টি সরকারি হাসপাতালে ১৭৫ জন রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫৬ জন রোগী। এ ছাড়া রাজধানীর ৫৯টি বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৪৭ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির পানি জমে থাকার কয়েক দিনের মধ্যেই এডিস মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে বাসাবাড়ি, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নগরজুড়ে পানি জমে থাকা। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় মশার প্রজননস্থল বাড়ছে। অনেক এলাকায় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবেও জমে থাকা পানি দীর্ঘদিন অপসারণ হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গায় এডিস মশার হটস্পট তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ঠিকানা নিয়ে তাদের বাসার আশপাশে এডিস মশার বিস্তারের স্থান খুঁজে ধ্বংস করতে হবে। রোগী খোঁজার সঙ্গে মশাও খুঁজতে হবে। প্রতিটি জেলায় র‌্যাপিড রেসপন্স টিম আছে। কীটতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগাতে হবে। জ্বর আছে এমন রোগীদের ‘এনএস১’ টেস্ট করতে হবে। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে আক্রান্তকে মশারির মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা বিবেচনা করে কাজ করতে হবে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।’

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গুজ্বর মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য হাসপাতালের ১০ শতাংশ শয্যা খালি রাখা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে পরীক্ষা করতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষার ফি ৩০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ টাকা করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অতিরিক্ত এক লাখ স্যালাইন ব্যাগও মজুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত স্যালাইন পাঠানো হয়েছে।’