ধনকুবের থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, চীনা ব্যবসায়ীর উত্থান-পতন

একসময়ের এশিয়ার শীর্ষ ধনী ও চীনা আবাসন খাতের পরাশক্তি এভারগ্র্যান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানের জীবনের চাকা ঘুরে গেছে নাটকীয়ভাবে। চীনের শেনঝেন শহরের একটি আদালত আর্থিক জালিয়াতি, তহবিলের অপব্যবহার ও অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহের দায়ে ৬৭ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। সাজা ঘোষণার পাশাপাশি তার সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মাত্র কয়েক বছর আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২১ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উদ্ভব অনুষ্ঠানে তৎকালীন কোটিপতি হুই কা ইয়ানকে তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে হাসিমুখে সিনিয়র নেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল। অনেকেই তখন বিষয়টিকে সরকারের পক্ষ থেকে তার ব্যবসার প্রতি সমর্থনের বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে, দীর্ঘ তিন বছর আটক থাকার পর, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে হলো এই শিল্পপতিকে।

হেনান প্রদেশের এক সাধারণ গ্রামীণ পরিবারে জন্ম নেওয়া হুই কা ইয়ান বড় হয়েছিলেন দাদির কাছে। ইস্পাত কারখানার টেকনিশিয়ান থেকে আবাসন খাতের সম্রাট হয়ে ওঠার গল্পটি একসময় অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত তার প্রতিষ্ঠান এভারগ্র্যান্ড দ্রুতগতিতে দেশের বৃহত্তম আবাসন কোম্পানি হয়ে ওঠে। ব্যাপক পরিমাণ ঋণ নিয়ে জমি কেনা এবং তুলনামূলক কম দামে দ্রুত ফ্ল্যাট বিক্রি করার কৌশল কাজে লাগিয়ে ২০২০ সালে কোম্পানিটি বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থমূল্যের বিক্রির মাইলফলক স্পর্শ করে। ২০১৭ সালে ফোর্বসের তালিকায় ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে এশিয়ার শীর্ষ ধনীর তকমা পান হুই।

তবে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর এই ব্যবসায়িক মডেলই শেষ পর্যন্ত এভারগ্র্যান্ড এবং হুই কা ইয়ানের পতনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণে জর্জরিত এভারগ্র্যান্ড ২০২১ সালে তাদের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে হংকংয়ের আদালতের নির্দেশে কোম্পানিটি অবসায়নের প্রক্রিয়ায় চলে যায়। ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বাঁচানোর তাগিদে ইলেকট্রিক গাড়ি ও ফুটবলের মতো চীনা সরকারের পছন্দের প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি হুই।

আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, আর্থিক বিবরণীতে কারচুপি, শেয়ারবাজারে প্রতারণা এবং জনস্বার্থের চরম ক্ষতির অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় হুই কা ইয়ানকে সর্বোচ্চ দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এভারগ্র্যান্ড গ্রুপকে প্রায় ১.৩১ বিলিয়ন ডলার এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ১ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। দেশটির আবাসন সংকটের মুখে কোটি কোটি সাধারণ বিনিয়োগকারী ও ক্রেতার আর্থিক ক্ষতির পর এভারগ্র্যান্ডের পতনের এই ট্র্যাজিক অধ্যায় হুই কা ইয়ানকে নিয়ে গেল কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে।

সূত্র: রয়টার্স