বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য আবাসন সুবিধার বাইরে। তীব্র যানবাহন সংকটের কারণে অনেক থানায় নিয়মিত টহল কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
আবার ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি ও সাইবার হয়রানির মতো অপরাধ বাড়ছে। এসব মোকাবেলায় নেই তেমন আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক সরঞ্জাম।
এমন সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নতুন করে পুলিশ সদস্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যদিও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে কেবল সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হলে বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিবর্তে ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশ পুলিশে সদস্য সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজারের মতো। দেড় দশকের ব্যবধানে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই লাখে। অর্থাৎ এ সময়ে বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার নতুন সদস্য।
সেই সঙ্গে পুলিশের কার্যক্রম ও দায়িত্বের পরিধিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে নতুন ছয়টি ইউনিট—পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) পুলিশ।
নতুন নতুন অপরাধ মোকাবেলা, বিশেষায়িত তদন্ত, সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, পর্যটকদের নিরাপত্তা, নৌপথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব ইউনিট গঠন করা হয়।
বর্তমানে পুলিশে কনস্টেবলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার। মাঠপর্যায়ে সরাসরি দায়িত্ব পালনকারী এ সদস্যদের বড় অংশই বিভিন্ন থানা ও রিজার্ভ ফোর্সে কর্মরত।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, টহল, আসামি গ্রেফতার এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারাই মূলত পুলিশের সম্মুখসারির জনবল। তবে সদস্য সংখ্যা ও দায়িত্ব বাড়লেও এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়েনি আবাসন, যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
আবাসন সুবিধা পেয়ে থাকেন বাহিনীর মাত্র ১০ শতাংশ সদস্য। বাকিদের কর্মস্থলের বাইরে বা ভাড়া বাসায় বসবাস করতে হচ্ছে। এতে তাদের যেমন আর্থিক ব্যয় বাড়ছে, প্রভাব পড়ছে কর্মঘণ্টা ও দায়িত্ব পালনের ওপরও।
পুলিশের কাছ থেকে ভালো সেবা পেতে হলে সবার আগে স্বাস্থ্যকর আবাসনসহ তাদের মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ডিউটির পর ভালো বিশ্রাম না পেলে তার প্রভাব পুলিশের কাজের ওপর পড়ে।
এজন্যই সবার আগে পুলিশের এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করে লোকবল বাড়ালে বাহিনীতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আবার থানাগুলোয় যানবাহন সংকটের কারণে পুলিশ নিয়মিত টহল দিতে পারে না।
এ সুযোগে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।’ অপরাধ প্রতিরোধ এবং জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরিতে পুলিশের টহল কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে মোট ১৫ হাজার ৮৫১ জন নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে সিংহভাগই ছিল ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি)।
পরবর্তী সময়ে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন করে পুলিশে আরো ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের ঘোষণা দেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে জনবল বৃদ্ধি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কমিটিকে জানান, এরই মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার কনস্টেবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং চলতি বছরে আরো ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এ নিয়োগ বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। একই সঙ্গে আগে স্থগিত থাকা দুই হাজার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরাসরি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য শিরীন সুলতানা বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য আরো লোকবল প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধেও পুলিশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হচ্ছে, সেখানেও তাদের উপস্থিতি বাড়াতে হবে। এর জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে লোকবল এবং গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে বলা হয়েছে। আমরাও এ দুটি বিষয়ে একমত হয়েছি।’
অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না বাড়িয়ে ধারাবাহিকভাবে পুলিশে নিয়োগ দেয়া হলে তা বাহিনীর কার্যকারিতা ও কর্মপরিবেশে চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গত দেড় দশকে পুলিশে দফায় দফায় নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
কোনো কোনো বছরে দুবারও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে অনুপাতে আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় মৌলিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগও প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল।
যানবাহন সংকটের কারণে অনেক থানার পুলিশ নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। অথচ সেখানে লোকবলের ঘাটতি নেই। ফলে আড়াই লাখ সদস্যের পুলিশ বাহিনী থাকলেও মাঠ পর্যায়ে সেবা কার্যক্রমের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ সদস্য নেই-এটা সত্য। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে হলে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল বাড়ানোর বিকল্প নেই।
তবে শুধু সদস্য সংখ্যা বাড়ালেই পুলিশের সক্ষমতা বাড়বে না। নতুন নিয়োগের আগে বাহিনীর যানবাহন, আবাসন, সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামোগত ঘাটতি চিহ্নিত করে সেগুলো পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া অতিরিক্ত সদস্য নিয়োগ দিলে তাদের কর্মপরিবেশ আরো সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ ছিল। আশা করি, এ সরকারের সময় পুলিশের নিয়োগে অতীতের পুনরাবৃত্তি হবে না। যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাহিনীর প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতেই নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।’
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কেবল পুলিশ সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না। বরং সীমিত জনবল ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং দক্ষ পুলিশিং ব্যবস্থা।
কেননা বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরন, কৌশল ও পরিধি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি, ডিজিটাল জালিয়াতি ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে।
ফলে জনবলনির্ভর পুলিশিং দিয়ে আধুনিক সময়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে উঠছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি বলে মনে করেন তারা।
এক্ষেত্রে আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক সরঞ্জাম, সিসিটিভি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বায়োমেট্রিক ও পরিচয় শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের নিয়মিত এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ জরুরি।
সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের সময় বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার পুলিশ ও নাগরিক-উভয় পক্ষের জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে। তবে এসব তথ্য কোথায়, কতদিন এবং কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
পুলিশের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল কাইয়ুম।
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইচ্ছামতো পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সোয়া লাখ থেকে বর্তমানে আড়াই লাখ সদস্য এ বাহিনীতে। আবার নতুন নতুন ইউনিটও তৈরি করা হয়েছে। সে তুলনায় তাদের আবাসন ব্যবস্থা করা হয়নি। আবাসন সুবিধা না থাকায় ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়।
বিশেষ করে পরিবার নিয়ে থাকা সদস্যদের জন্য এ সংকট আরো তীব্র। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নৈতিক চর্চা প্রতিফলিত হওয়া খুবই কঠিন। পুলিশের কাছ থেকে নৈতিক ও পেশাদার সেবা পেতে হলে অবশ্যই তাদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে হবে। তা না হলে এটি বাহিনীর ভারসাম্যের জন্যও ক্ষতিকর হবে।’
এদিকে সদ্য শেষ হওয়া এএসআই পদে সরকারি নিয়োগেও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের কাঙ্ক্ষিত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি। বরং বাহিনীতে কর্মরত কনস্টেবলরাই সরাসরি এএসআই পদে চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। পেশাগত ঝুঁকি ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীদের পুলিশে আগ্রহী করে তোলা যাচ্ছে না বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘পুলিশে সরাসরি এএসআই নিয়োগে প্রত্যাশার তুলনায় কম সাড়া পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের পেশাগত ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং বাহিনীকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব ও ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কিন্তু সংকট বা বিতর্কের সময় তাদেরই সবচেয়ে বেশি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। এ বাস্তবতা অনেক তরুণকে মাঠ পর্যায়ের পুলিশি পেশায় আসার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করছে।’





