যেভাবে চিনবেন এআই  ভিডিও

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও তৈরির প্রযুক্তিও পৌঁছে গেছে নতুন এক পর্যায়ে। এখন শুধু কয়েকটি লিখিত নির্দেশনা দিয়েই এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখতে অনেকটাই বাস্তব ঘটনার মতো। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও দেখার পর সেটি সত্যি নাকি এআই দিয়ে তৈরিÑ তা বোঝা সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

গুগলের ভিও, ক্লিং এআইসহ বিভিন্ন ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি মানুষের মুখভঙ্গি, শরীরের নড়াচড়া, আলো-ছায়া এমনকি কণ্ঠস্বরও আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবভাবে উপস্থাপন করতে পারছে। একই সঙ্গে ছবি বা ভিডিওর উৎস শনাক্ত করার জন্য সি২পিএ কনটেন্ট ক্রেডেনশিয়ালস এবং গুগলের সিনথআইডির মতো প্রযুক্তিও তৈরি হয়েছে। তবে এসব প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রে শতভাগ নির্ভুল নয়। তাই কোনো ভিডিও চোখে পড়লেই সেটি সত্য ধরে নেওয়ার আগে কিছু বিষয় খেয়াল করা জরুরি।

এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে মানুষের মুখ ও শরীরের স্বাভাবিক নড়াচড়া গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। ভিডিওটি মনোযোগ দিয়ে দেখলে চোখের পলক ফেলার ধরন অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। মুখের অভিব্যক্তি ও কথার আবেগের মধ্যেও অসামঞ্জস্য দেখা যেতে পারে।

ভিডিও একটু ধীরে চালিয়ে দেখলে আরও কিছু বিষয় চোখে পড়তে পারে। এক ফ্রেম থেকে আরেক ফ্রেমে যাওয়ার সময় চোখ, চুল, দাঁত কিংবা ত্বকের গঠনে হঠাৎ পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা খেয়াল করুন।

শরীরের নড়াচড়ার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বাস্তব মানুষের হাঁটা, দৌড়ানো বা হাত নাড়ানোর মধ্যে ছোট ছোট স্বাভাবিক পরিবর্তন থাকে। এআই ভিডিওতে অনেক সময় এসব নড়াচড়া অতিরিক্ত মসৃণ বা কৃত্রিম মনে হতে পারে। কেউ কথা বলার সময় তার কণ্ঠস্বর ও ঠোঁটের নড়াচড়ার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা স্বাভাবিক। এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ভিডিওতে কখনো কখনো এই সমন্বয়ে সমস্যা দেখা যায়।

বিশেষ করে বাক্যের শেষের দিকে শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে ঠোঁটের নড়াচড়া ঠিকমতো মিলছে কি না, তা লক্ষ্য করা যেতে পারে। তবে সামান্য অমিল দেখেই ভিডিওটিকে এআই-নির্মিত বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কারণ কণ্ঠস্বর নকল ও ঠোঁটের নড়াচড়া মিলিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তিও দ্রুত উন্নত হচ্ছে।

এআই ভিডিওর অন্যতম দুর্বল জায়গা হতে পারে আলো ও ছায়ার স্বাভাবিক ব্যবহার। বাস্তব দৃশ্যে আলো যে দিক থেকে আসে, সাধারণত ছায়াও সেই অনুযায়ী তৈরি হয়। কিন্তু এআই দিয়ে বানানো দৃশ্যে কখনো ছায়া ভুল দিকে পড়তে পারে বা ছায়ার আকার বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।

আয়না, কাচ কিংবা চকচকে কোনো পৃষ্ঠ থাকলে সেখানকার প্রতিফলনও ভালোভাবে দেখুন। মূল দৃশ্যের সঙ্গে প্রতিফলিত ছবির মিল নেই কি না, তা বোঝার চেষ্টা করুন। একইভাবে ভিডিওর বিভিন্ন অংশে হঠাৎ আলো কমে বা বেড়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও সন্দেহের কারণ হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এখন এআই দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্ট শনাক্ত করতে লেবেল ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। তাই কোনো ভিডিও দেখার সময় প্ল্যাটফর্মে দেওয়া তথ্য বা সতর্কবার্তাও দেখে নেওয়া উচিত।

কিছু ক্ষেত্রে ভিডিওর পাশে এআই-সংক্রান্ত তথ্য, পরিবর্তিত কনটেন্টের সতর্কতা কিংবা ওয়াটারমার্ক দেখা যেতে পারে। এসব তথ্য ভিডিওটির প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। তবে লেবেল না থাকলেই ভিডিওটি বাস্তবÑ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। কারণ সব এআই ভিডিও শনাক্ত বা চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। আবার কখনো বাস্তব ভিডিওতেও ভুলভাবে এআই-সংক্রান্ত সতর্কতা দেখা যেতে পারে।

কোনো ভিডিও সত্য কি না বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলোÑ এর মূল উৎস খুঁজে দেখা। ভিডিওটি প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়েছে, কে প্রকাশ করেছে এবং ঘটনাটি নিয়ে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ বা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি নাÑ এসব যাচাই করুন।

যে অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি এসেছে, সেটির পুরোনো পোস্টও দেখা যেতে পারে। অ্যাকাউন্টটি নতুন কি না, আগে কী ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ করেছে এবং একই ভিডিও অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে কি নাÑ এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু অ্যাকাউন্ট নতুন বা অস্বাভাবিক মনে হলেই ভিডিওটিকে ভুয়া বলা ঠিক নয়। বরং ভিডিওর উৎস, সময়, স্থান, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এআই প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, শুধু চোখে দেখে ভিডিওর সত্যতা নির্ধারণ করা তত কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই কোনো ভিডিও অস্বাভাবিক মনে হলে সেটি দ্রুত অন্যদের কাছে পাঠানোর বদলে আগে যাচাই করা উচিত।