আভিধানিক অর্থে আধুনিকতা বলতে অনেকেই স্রেফ পশ্চিমা ধারার অন্ধ অনুকরণ কিংবা নিত্যনতুন এক্সপেরিমেন্টকে বুঝে থাকেন। কিন্তু ফ্যাশন দর্শনের গভীরে উঁকি দিলে দেখা যায়, আধুনিকতা কেবল নতুন কিছু সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একইসঙ্গে অতীতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুরোনোকে নতুন কাটিং, প্যাটার্ন ও ফিনিশিংয়ে ফিরিয়ে আনার শৈল্পিক প্রক্রিয়াও। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে, ফ্যাশন দুনিয়ার ক্ষেত্রে এই বাক্যটি শতভাগ প্রযোজ্য। দশ বছর আগে যে স্টাইলটি সময়োপযোগী নয় বলে আলমারির কোণে ঠাঁই পেয়েছিল, আজ তা-ই নতুন রূপে নস্টালজিয়া ও নব্যতার সংমিশ্রণে আত্মপ্রকাশ করছে আধুনিক ফ্যাশনিস্তাদের কাছে। বিগত শতাব্দীর বিভিন্ন দশকের আইকনিক পোশাক ও অনুষঙ্গগুলো আধুনিক ক্যানভাসে আবার রাজত্ব করতে শুরু করেছে। এই ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ বা ভিনটেজ রিভাইভাল ধারণাটি কেবল নস্টালজিয়া নয়, বরং আজকের তরুণ প্রজন্মের স্বাধীনচেতা মানসিকতা ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধের বহির্প্রকাশ। সত্তরের হিপি কালচার কিংবা নব্বইয়ের হিপহপ আন্দোলন, সবকিছুর নান্দনিক ছোঁয়া আজ আবার আধুনিক স্ট্রিট ফ্যাশন ও র্যাম্পে প্রতাপের সঙ্গে বিরাজমান।
জেন-জিদের নব্বইয়ের আমেজ
বিগত শতকের আশির ও নব্বইয়ের দশকে রাজত্ব করা ঢিলেঢালা পোশাকের চল আজকের জেন-জি তরুণদের কাছে নতুন রূপে চরম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আধুনিক জীবনযাত্রায় শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা পোশাকই এখন আধুনিকতার প্রধান মাপকাঠি। বড় মাপের শার্ট, টি-শার্ট, ক্রপ হুডি কিংবা ঢিলেঢালা প্যান্টের মতো পোশাকগুলো একদিকে যেমন পরতে আরামদায়ক, অন্যদিকে তা ব্যক্তিচেহারায় নিয়ে আসে আধুনিক স্ট্রিট-স্টাইল ভাইব।
একই ধারায় প্রায় দুই যুগ পর প্রতাপের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন করেছে ব্যাগি প্যান্ট। ১৯৮০-এর দশকে আমেরিকান হিপহপ কালচার ও র?্যাপ মিউজিকের হাত ধরে ব্যাগি প্যান্টের উত্থান ঘটেছিল, যা তরুণদের স্বাধীন ব্যক্তিত্ব ও সহজ চলাচলের প্রতীক ছিল। ২০০০ সালের পর কিছুদিনের জন্য এর কদর কমলেও, বর্তমানে হাইওয়েস্ট, ডিস্ট্রেসড বা ডিপ ফিট স্টাইলে এটি আবার স্ট্রিট ফ্যাশনের শীর্ষে।
ক্যাজুয়াল লুকের নতুন ব্যাকরণ
ফ্যাশন দুনিয়ায় ডেনিম হলোÑ এমন একটি উপাদান, যা কখনো পুরোনো হয় না; কেবল নিজের রূপ বদলায়। ১৯৫০-এর দশকে লেদার জ্যাকেটের পাশাপাশি বিশ্ব ফ্যাশনে ডেনিমের আবির্ভাব ঘটে। অনেকেই জিন্স ও ডেনিমকে একই ভাবেন, তবে মূল পার্থক্য হলো, ডেনিম হলো এক বিশেষ বুননের কাপড়ের নাম, আর সেই ডেনিম কাপড় দিয়ে তৈরি প্যান্টকে বলা হয় জিন্স। অর্থাৎ সব জিন্সই ডেনিম, কিন্তু সব ডেনিম জিন্স নয়। বর্তমানে ফেডেড ডেনিম, লাইট ব্লু বা ডার্ক ব্লু ডেনিম জ্যাকেট ও শার্টের চাহিদা তুঙ্গে। একই সঙ্গে দেশীয় ফ্যাশনে গুরুত্ব পাচ্ছে টেকসই, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব ডেনিম ফেব্রিক।
ডেনিমের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে পরা ক্রপ টপস এখন ট্রেন্ডে। ১৯৬০-এর দশকের হিপি আন্দোলন ও পপ কালচারের মাধ্যমে পপ-আপ করা এই পোশাকটি ১৯৮০-৯০-এর দশকে ব্যাপক বিস্তৃত হয়। আধুনিক যুগে ক্রপ টপস কেবল ক্যাজুয়াল ওয়্যার নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনধারার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে স্ট্রিট ফ্যাশন থেকে শুরু করে ক্যাজুয়াল পার্টি পর্যন্ত।
রেনেসাঁ থেকে পপ কালচার
আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ভিক্টোরিয়ান যুগে সূক্ষ্ম ফুলের প্যাটার্ন দিয়ে ফ্লোরাল প্রিন্টসের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে পপ কালচার
এবং হিপি মুভমেন্টের সঙ্গে তা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আজকের ফ্যাশনে ছোট, বড় কিংবা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ফ্লোরাল প্রিন্ট আবারও ফিরে এসেছে সমান দাপটে। সুতি, শিফন কিংবা লিনেন কাপড়ে ফ্লোরাল প্রিন্টের শাড়ি, ম্যাক্সি ড্রেস বা কুর্তি আধুনিক নারীদের আলমারির অপরিহার্য অংশ। অন্যদিকে পোশাকের এই ক্লাসিক রূপকে পূর্ণতা দেয় ভিনটেজ জুয়েলারি। ১৯২০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই গ্ল্যামারাস জুয়েলারিগুলো তাদের ঐতিহ্য ও নিখুঁত কারুকাজের জন্য পরিচিত। আজকের তরুণরা যেকোনো আধুনিক ক্যাজুয়াল বা ফিউশন পোশাকের সঙ্গে অ্যান্টিক ফিনিশিংয়ের মেটাল, কপার বা সিলভারের ভিনটেজ গহনা পরে এক ধরনের নস্টালজিক লুক ফুটিয়ে তুলছেন।
ক্লাসিক স্নিকার্স
একসময় খেলাধুলার মাঠ বা জিমনেসিয়ামে আবদ্ধ থাকা কেডস আজ রূপ নিয়েছে আধুনিক স্নিকার্স-এ। ঢিলেঢালা ওভারসাইজড পোশাক, ব্যাগি প্যান্ট কিংবা শাড়ির সঙ্গে স্নিকার্স পরা এখন বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত কালচার। ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কনভার্স কোম্পানি নন-স্কিড নামে প্রথম স্নিকার তৈরি করে। পরবর্তীতে ১৯৫০-৬০ এর দশকে আমেরিকান বাস্কেটবল দলগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে এটি মূলধারার ফ্যাশনে প্রবেশ করে। সুতির ক্যাজুয়াল সালোয়ার-কামিজ, ওয়েস্টার্ন ড্রেস কিংবা ডেনিম, যেকোনো পোশাকের সঙ্গেই এখন স্নিকার্স বেশ মানানসই। এটি পায়ের সুরক্ষা ও দীর্ঘক্ষণ হাঁটার কমফোর্ট নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো লুকের মধ্যে একটি স্মার্ট ও গতিশীল ভাব নিয়ে আসে।
নিখুঁত পোশাক নির্বাচন
ভিনটেজ বা আধুনিক, যেকোনো ফ্যাশন ট্রেন্ড অনুসরণ করার পূর্বে নিজের শরীর, স্বাচ্ছন্দ্য এবং পরিবেশের উপযোগী পোশাক বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বাজারচলতি ট্রেন্ডে অন্ধভাবে গা ভাসানোর চেয়ে সঠিক পোশাক নির্বাচন আপনাকে অনেক বেশি মার্জিত করে তুলতে পারে।
পোশাক কেনার সময় যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেন-
স্বাচ্ছন্দ্য : ট্রেন্ড যাই হোক না কেন, পোশাকের প্রধান শর্ত হলো স্বাচ্ছন্দ্য। অতিরিক্ত আঁটসাঁট বা অনুপযোগী কাটিংয়ের পোশাক পরা এড়িয়ে চলুন।
শরীরের গঠন : আপনার দৈহিক গঠন বিবেচনা করে কাট সিলেক্ট করুন। কম উচ্চতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভারী বা দীর্ঘ ব্যাগি প্যান্ট না পরে মানানসই বা অ্যাঙ্কেল-লেন্থ পোশাক বেছে নিন।
ফেব্রিকের স্থায়িত্ব ও পরিবেশ সচেতনতা : পোশাকের মেটেরিয়াল যেন ত্বকের বান্ধব এবং টেকসই হয়। সুতি, ডেনিম, লিনেনের মতো দীর্ঘস্থায়ী ফেব্রিক বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
স্থান ও পরিবেশ : কোথায় যাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে পোশাক পরুন। অফিসে অতি-ওভারসাইজড বা ক্যাজুয়াল ক্রপ টপসের বদলে সেমি-ফরমাল কাটিংয়ের স্মার্ট পোশাক পরা ভালো।
ফ্যাশন হলো মূলত নিজেকে প্রকাশের একটি ভাষা। অতীত আর বর্তমানের সেরা উপাদানগুলোকে নিজের রুচি অনুযায়ী মেলবন্ধন ঘটিয়ে পরিধান করাই হলো আধুনিক ফ্যাশনের মূল কথা। ইতিহাসের এই সুন্দর ফিরে আসাকে নিজের স্টাইলে ধারণ করুন; নিজেকে তুলে ধরুন আত্মবিশ্বাসী ও অনন্যরূপে।





