সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথিরা। হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, হামলায় অস্ত্রের গুদাম ও কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এসব স্থাপনা হুথিদের দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন পরিচালনা করছিল। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাননি তিনি। হুথিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ইয়াহিয়া সারি আরও সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি ভূখণ্ডের আরও গভীরে বড় ধরনের হামলা চালানো হবে।

এদিকে সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শনিবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জাজান অঞ্চলের আল তুওয়াল গভর্নরেটে একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে দুইজন আহত হয়েছেন। এতে একটি মসজিদ, বেশ কয়েকটি ভবন ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র সংঘাত

গত সপ্তাহে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর নতুন করে লড়াই শুরু হয়। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে আসছে সৌদি আরব।

এর মধ্যেই হুথিরা দাবি করেছে, তারা পশ্চিম তাইজ প্রদেশে অগ্রসর হয়ে উপকূলীয় শহর মোখা ও লোহিত সাগরের একটি বন্দর দখল করেছে। এর ফলে তারা বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি চলে এসেছে। অন্যদিকে সরকারি বাহিনী সৌদি সীমান্তঘেঁষা উত্তর আল জাওফ প্রদেশে অগ্রগতি অর্জন করেছে।

ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাইজ অঞ্চলে হুথিদের অবস্থান ও ব্যারাকে তিনটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, মোখা বন্দরের কাছে হুথি যোদ্ধাদের বহনকারী যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।

ট্রাম্পকে ফোন করেছিলেন সৌদি যুবরাজ

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত সপ্তাহে দুইবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ জানান। তবে সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

শনিবার আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, হুথিরা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো লড়াই করতে চায় না। তারা চায়, যুক্তরাষ্ট্র যেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়। ট্রাম্প আরও বলেন, এই অঞ্চলে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।

সৌদির তেল পাইপলাইনেও ড্রোন হামলা

হুথিদের এই অভিযানের মধ্যেই সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার ভোরে রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে এই হামলা হয়।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ইরাক থেকে এসেছে। হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পাইপলাইনে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল সরবরাহের সৌদির একমাত্র পথটি আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে।

সৌদির তেল পাইপলাইনে হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ইরান এ হামলার পেছনে জড়িত থাকতে পারে। তবে ইরাকও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, তাদের ভূখণ্ড ও আকাশসীমা কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হবে না। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল জাইদি ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল বুদাইউই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য একটি বিপজ্জনক ও অগ্রহণযোগ্য হুমকি। তিনি ইরাককে তাদের ভূখণ্ড থেকে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সংঘাতে ঘরছাড়া ৭৬ হাজার

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, জুলাই থেকে এ পর্যন্ত লড়াইয়ের কারণে ৭৬ হাজার মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। শুধু গত সপ্তাহেই বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে।

ইয়েমেনের অর্থমন্ত্রী ইলিয়াস মৌসা দাওয়ালেহ জানিয়েছেন, প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন। দুই পক্ষের সূত্র অনুযায়ী, নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে ৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

কীভাবে শুরু হয়েছিল ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা ও কয়েকটি প্রদেশ দখল করার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে দেশটিতে হস্তক্ষেপ করে।

২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনের পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। তবে জুলাই থেকে দেশটিতে আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, আনতারা, গার্ডিয়ান