রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের লড়াই এখন শুধু নিজ ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকার মরুভূমিতেও রাশিয়ার মিত্রদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে কিয়েভ। উত্তর মালির উত্তপ্ত ও ধুলোময় পরিবেশে স্থানীয় বিদ্রোহীদের ড্রোন পরিচালনা ও যুদ্ধকৌশল শেখাচ্ছেন ইউক্রেনের সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালিতে প্রায় ১৫ জন ইউক্রেনীয় বিশেষজ্ঞ মোতায়েন রয়েছেন। তাঁরা মূলত উত্তরাঞ্চলের তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের নিয়ে গঠিত আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্টকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তাঁরা সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন না।
মালিতে থাকা এক ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটর সিএনএনকে জানান, বিদ্রোহীরা মাঠে গিয়ে ড্রোন পরিচালনা করেন। তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ড্রোনের সংকেত পান এবং বেতারে তাঁদের নির্দেশনা দেন। অভিযান শেষে তাঁদের সঙ্গে বসে পুরো কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন।
মালি ছাড়াও সুদানে ইউক্রেনের কয়েকজন সামরিক বিশেষজ্ঞ অবস্থান করছেন বলে দেশটির প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে। চাদ, নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর সেনারাও আগে মালিতে গিয়ে ইউক্রেনীয়দের কাছ থেকে ড্রোন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাশিয়ার আফ্রিকা অভিযান
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার প্রভাব বাড়ছে। ফরাসি ও অন্যান্য পশ্চিমা বাহিনী সরে যাওয়ার পর রাশিয়া সেখানে নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। বিনিময়ে স্থানীয় সরকারগুলোর কাছ থেকে অর্থ ও খনিজ সম্পদে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে মস্কো।
প্রথমদিকে এসব কার্যক্রমে ওয়াগনার গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেছিল রাশিয়া। ২০২৩ সালে ওয়াগনার প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের মৃত্যুর পর গোষ্ঠীটির অবশিষ্ট অংশকে রুশ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একীভূত করে গঠন করা হয় আফ্রিকা কোর। বর্তমানে এটি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মস্কোর মিত্র সরকারগুলোকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আফ্রিকায় তাদের তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরি করা এবং দেশটিকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখানোর ধারণাকে দুর্বল করা। তাঁর ভাষায়, ড্রোনযুদ্ধে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে ইউক্রেন এখন পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
কৌশল বদলাচ্ছে দুই পক্ষই
ইউক্রেনের জন্য মালির যুদ্ধক্ষেত্রও একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দেশটির সামরিক পরিবেশ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে অনেকটাই আলাদা।
ইউক্রেনীয় এক ড্রোন অপারেটর জানান, প্রচণ্ড গরম, ধুলা ও বালুর কারণে ব্যাটারি, যন্ত্রপাতি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে মরুভূমির পরিবেশে ড্রোন পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়।
তাঁর মতে, ইউক্রেনে যুদ্ধের ধরন অনেক বেশি তীব্র। সেখানে ব্যাপক হামলা ও অবিরাম চাপের মধ্যে লড়াই চলে। কিন্তু মালিতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট ছোট দল, অতর্কিত হামলা, পথ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির জ্ঞানের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
ইউক্রেনীয় সেনারা স্থানীয় যোদ্ধাদের যুদ্ধকৌশল শেখাচ্ছেন, আর স্থানীয়রা তাঁদের কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল শেখাচ্ছেন।
কিদালের নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা
২০২৪ সাল থেকেই তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইউক্রেনের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। ওই বছরের জুলাইয়ে আলজেরিয়া সীমান্তের কাছে তিঞ্জাওয়াতেন এলাকায় বিদ্রোহীদের হামলায় ওয়াগনার যোদ্ধা ও মালির সেনাদের কয়েকজন নিহত হন। তখন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের মুখপাত্র আন্দ্রি ইউসভ বিদ্রোহীদের ‘প্রয়োজনীয় তথ্য’ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
চলতি বছরের শুরুতে কিদাল শহর দখলেও ইউক্রেনীয়রা বিদ্রোহীদের সহায়তা করেছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন মালিতে থাকা এক ড্রোন অপারেটর। তুয়ারেগ বিদ্রোহী ও আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত যোদ্ধাদের একযোগে হামলার মুখে রুশ সেনারা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্য ওই ঘটনায় ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ভাড়াটে প্রশিক্ষকদের ভূমিকার অভিযোগ করেছে। কিয়েভ এর আগে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বড় ধরনের সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
লিবিয়াতেও ইউক্রেনের ড্রোন
আফ্রিকায় ইউক্রেনের তৎপরতা শুধু মালিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম লিবিয়াতেও ইউক্রেনীয় নৌ ড্রোন অপারেটররা অবস্থান করছেন বলে সিএনএন জানিয়েছে।
লিবিয়ায় থাকা এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা জানান, মিসরাতা আন্তর্জাতিক সামরিক ঘাঁটিকে তাঁরা রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ছায়া বহরের’ বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের একটি বিস্ফোরকবাহী নৌ ড্রোন গ্রিসের পশ্চিমাঞ্চলের লেফকাদা দ্বীপের কাছে ভেসে উঠলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। গ্রিস এ ঘটনায় ইউক্রেনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। পরে কিয়েভ দুঃখ প্রকাশ করে এবং রাশিয়ার ওপর হামলার জবাবে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে এর জন্য দায়ী করে।
ইউক্রেনের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান কিরিলো বুদানভ ২০২৩ সালে বলেছিলেন, ইউক্রেনের লক্ষ্য হলো নিজেদের পূর্ণ বিজয় না আসা পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো জায়গায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখা। আফ্রিকায় সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই কৌশলেরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন





