ডিজিটাল যুগের মোড়কে দৃশ্যমান রঙিন পৃথিবীর নেপথ্যে জমাট বাঁধছে এক অদৃশ্য মানসিক ব্যাধি ‘সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানজাইটি’। প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল জগতে স্ক্রলিং, নোটিফিকেশনের লাল বাতির পেছনে ছোটা এবং অন্যের সাজানো জীবনের সাথে নিজের প্রতিদিনের বাস্তবতার তুলনা করতে গিয়ে দেশের বড় একটি তরুণ গোষ্ঠী আজ ডিজিটাল ফেটিগ বা মানসিক ক্লান্তিতে ভুগছে। তথ্যের অনবরত প্রবাহ এবং ক্রমাগত অনলাইনে যুক্ত থাকার এ তাগিদ তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের ধস নামাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে তাদের আত্মবিশ্বাসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা মানুষের মস্তিষ্কে সাময়িক আনন্দের ডোপামিন হরমোন ক্ষরণ বাড়ায়। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তির পরই নেমে আসে দীর্ঘস্থায়ী হতাশা। তরুণ সমাজ আজ ফোমো বা ফিয়ার অব মিসিং আউট-এ আক্রান্ত। অর্থাৎ, অন্য সবাই হয়তো আমার চেয়ে বেশি উপভোগ করছে বা এগিয়ে যাচ্ছে-এই আশঙ্কা থেকে তৈরি হচ্ছে এক ধরণের তীব্র সামাজিক দুশ্চিন্তা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল ফেটিগ; দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, ঘুমের অনিয়ম এবং ভার্চুয়াল সংবাদের অতিলৌকিক চাপ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো তরুণদের আত্মবিশ্বাসের মারাত্মক অবক্ষয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রদর্শিত নিখুঁত লাইফস্টাইল, ফিল্টার করা ছবি এবং তথাকথিত সফলতার মানদণ্ড তরুণ মনে তৈরি করছে এক অবাস্তব প্রত্যাশা। বাস্তব জীবনে তার সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটলেই তারা নিজেদের অযোগ্য ও ব্যর্থ ভাবতে শুরু করছে। ভার্চুয়াল লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দিয়ে নিজেদের মেধা ও বাহ্যিক রূপের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তারা নিজস্ব মৌলিকত্ব হারাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন সামাজিক যোগাযোগের স্বাভাবিক দক্ষতা কমছে, অন্যদিকে আত্মমর্যাদাবোধ তলানিতে গিয়ে ঠেকছে।
এই মানসিক সংকট থেকে উত্তরণে ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল স্ক্রিন টাইম সীমিত করা বা ডিজিটাল ডিটক্স-এর অভ্যাস গড়ে তোলা, বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং অবাস্তব ভার্চুয়াল মানদণ্ডের মানসিক ফাঁদ সম্পর্কে তরুণদের অবহিত করা জরুরি। একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তরুণরা লাইক বা কমেন্টের সংখ্যায় নিজের আত্মপরিচয় না খুঁজে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় নিজের আত্মবিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।





