বিশ্বকাপের ফাইনাল মানেই দুই দেশের লড়াই, দুই সংস্কৃতির আবেগ, দুই ফুটবল দর্শনের মুখোমুখি হওয়া! কিন্তু রোববার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এবার যে ফাইনালটি হতে যাচ্ছে, তার গল্পের শুরু ফুটবল দিয়ে নয়-ভাষা দিয়ে!
স্পেন ও আর্জেন্টিনা। দুটি দেশ, দুটি মহাদেশ, দুটি ভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি। অথচ ড্রেসিংরুমে শেষ নির্দেশনা, মাঠে সতীর্থকে ডাকা, রেফারির সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ কিংবা গোলের পর উল্লাস-সবকিছুর ভাষা এক। স্প্যানিশ!
বিশ্বকাপের প্রায় এক শতকের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয়েছিল। সেটিই ছিল একমাত্র বিশ্বকাপ ফাইনাল, যেখানে দুই দলের মাতৃভাষা ছিল একই। ৯৬ বছর পর আবারও সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে। তবে এবার দুই প্রতিবেশী দেশের নয়, দুই মহাদেশের স্প্যানিশ ভাষাভাষী দুই পরাশক্তির মধ্যে।
ভাষা এক হলেও ফুটবলের ভাষা কিন্তু এক নয়। স্পেনের ফুটবল তৈরি হয়েছে একাডেমির শৃঙ্খলায়। ছোট ছোট পাস, নির্ভুল অবস্থান, বলের নিয়ন্ত্রণ আর সমষ্টিগত পরিকল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে তাদের পরিচয়। বিশ্ব ফুটবল যাকে ‘টিকি-টাকা’ নামে চেনে, সেটি শুধু একটি কৌশল নয়, স্প্যানিশ ফুটবল সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। যেন বলই তাদের ভাষা, আর প্রতিটি পাস একেকটি বাক্য।
আর্জেন্টিনার গল্প একেবারেই আলাদা। তাদের ফুটবলের জন্ম শহরের গলি, ধুলোমাখা মাঠ আর প্রতিকূল পরিবেশে। সেখানে কৌশলের পাশাপাশি টিকে থাকার শিক্ষা আসে লড়াই করে। ড্রিবলিং, ব্যক্তিগত দক্ষতা, আবেগ, প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলার ক্ষমতা-এসবই আর্জেন্টাইন ফুটবলের পরিচয়ের অংশ। একই ভাষায় কথা বললেও মাঠে তাদের প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফাইনালের সবচেয়ে মজার দৃশ্য হয়তো দেখা যাবে ডাগআউটে। লিওনেল স্কালোনি যখন চিৎকার করে বলবেন, ‘ভামোস’, স্প্যানিশ ভাষার এই শব্দটির বাংলা অর্থ ‘চলো’, ‘এগিয়ে চলো’ বা ‘চল যাই’!
ঠিক একই ‘ভামোস’ শব্দে নিজের খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করবেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। রেফারির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে রদ্রি কিংবা রদ্রিগো ডি পল-দুজনই একই ভাষায় প্রতিবাদ জানাবেন। গ্যালারিতে দুই দলের সমর্থকদের গানও হবে একই ভাষায়, শুধু রঙ আর পতাকা হবে আলাদা।
এই ফাইনালের আরেকটি প্রতীকী দিকও রয়েছে। লিওনেল মেসির ফুটবল-জীবনের বড় অংশ কেটেছে স্পেনে। বার্সেলোনার একাডেমিতে গড়ে ওঠা মেসির ফুটবলীয় চিন্তা ও বিকাশের সঙ্গে স্প্যানিশ ফুটবলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে স্পেনের তরুণ বিস্ময় লামিন ইয়ামাল বড় হয়েছেন মেসিকে অনুসরণ করে। একজন স্পেনে তৈরি হয়ে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি হয়েছেন, আরেকজন স্পেনের জার্সিতে খেলছেন এমন একজনকে আদর্শ মেনে, যিনি নিজে আর্জেন্টিনার প্রতীক।
১৯৩০ সালের সেই প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে ৪-২ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। প্রায় এক শতাব্দী পরে আবারও স্প্যানিশ ভাষার ফাইনালে নামছে তারা। ইতিহাসের সেই অপূর্ণতা মুছে দেওয়ার সুযোগ এবার মেসিদের সামনে। অন্যদিকে স্পেন চাইবে প্রমাণ করতে, ইউরোপীয় স্প্যানিশ ফুটবলের আধুনিক দর্শনই এখনো বিশ্বের সেরা।
ফুটবল সাধারণত মানুষকে ভাগ করে দেয় জার্সির রঙে, দেশের পরিচয়ে, ভাষা ও সংস্কৃতিতে। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল যেন উল্টো গল্প বলছে। এখানে ভাষা একই, আবেগের শব্দ একই, উল্লাসের উচ্চারণও একই। আলাদা শুধু স্বপ্ন।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ট্রফি উঠবে এক দলের হাতেই। কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই লড়াই বিশ্বকাপের ইতিহাসে মনে রাখা হবে অন্য এক কারণে-এটি এমন এক ফাইনাল, যেখানে প্রতিপক্ষকে হারানোর ডাকও উচ্চারিত হবে একই ভাষায়!





