৭০ বছরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গৌরব ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ৩ আগস্ট একটি স্মরণীয় দিন। ঠিক ৭০ বছর আগে, ১৯৫৬ সালের এই দিনে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে মুক্তি পায় ‘মুখ ও মুখোশ’—তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত প্রথম বাংলা সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই ছবির মাধ্যমেই শুরু হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা, যা পরবর্তীতে ‘ঢালিউড’ নামে পরিচিতি পায়।

চলচ্চিত্রটি উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। পরিচালনা করেন আবদুল জব্বার খান। চলচ্চিত্র নির্মাণে অভিজ্ঞতা না থাকলেও প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সাহসের জোরে তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন।

দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে কোনো চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে ওঠেনি। প্রেক্ষাগৃহে কলকাতার বাংলা ছবি, হিন্দি সিনেমা, পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু ছবি এবং হলিউডের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হলেও স্থানীয়ভাবে বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ ছিল না।

১৯৫৩ সালে স্থানীয়ভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আয়োজিত এক সভায় পূর্ব পাকিস্তানের আবহাওয়ায় সিনেমা নির্মাণ সম্ভব নয়—এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে আবদুল জব্বার খান ঘোষণা দেন, তিনি নিজেই বাংলা ছবি নির্মাণ করবেন। সেই ঘোষণাই পরবর্তীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস বদলে দেয়।

নিজের লেখা নাটক ‘ডাকাত’ অবলম্বনে তিনি তৈরি করেন ‘মুখ ও মুখোশ’-এর চিত্রনাট্য। পুরোনো একটি ক্যামেরা, সাধারণ টেপ রেকর্ডার এবং সীমিত প্রযুক্তি নিয়েই শুরু হয় শুটিং। স্টুডিও, দক্ষ কলাকুশলী কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি—কিছুই ছিল না। এমনকি নারী শিল্পী খুঁজে পেতেও সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছিল।

১৯৫৩ সালের শেষ দিকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হওয়া শুটিং শেষ হয় প্রায় দুই বছর পর। পরে চলচ্চিত্রটির নেগেটিভ প্রসেসিং ও সম্পাদনার কাজ সম্পন্ন হয় লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে। নানা বাধা পেরিয়ে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি শহরে এবং দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পায়।

ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেন সমর দাস। গান করেন আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসনাত। অভিনয়ে ছিলেন আবদুল জব্বার খান, পূর্ণিমা সেনগুপ্ত, জহরত আরা, নাজমা (পিয়ারী বেগম), ইনাম আহমেদসহ অনেকে। তাঁদের অধিকাংশই কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই ইতিহাসের অংশ হতে কাজ করেছিলেন।

গত সাত দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়েছে। একসময় দেশে বছরে শতাধিক সিনেমা নির্মিত হতো এবং প্রায় ১ হাজার ৭০০ সিনেমা হল ছিল। বর্তমানে নিয়মিত চালু রয়েছে অল্পসংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ। ভালো গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য এবং মানসম্পন্ন নির্মাণের অভাবকে চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন অনেক এগিয়েছে। আধুনিক ক্যামেরা, উন্নত পোস্ট-প্রোডাকশন, ভিএফএক্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নির্মাতাদের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি সফল চলচ্চিত্র আবারও দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহমুখী করেছে।

‘মুখ ও মুখোশ’-এর ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে চলচ্চিত্র ইতিহাসভিত্তিক পোস্টার প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অতীত যেমন গৌরবময়, তেমনি ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করতে প্রয়োজন শক্তিশালী গল্প, দক্ষ নির্মাতা এবং আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের সম্প্রসারণ।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, সাত দশক আগে যে স্বপ্নের বীজ ‘মুখ ও মুখোশ’ রোপণ করেছিল, সেই স্বপ্নকে নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও মানসম্মত নির্মাণের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ করাই এখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।