আমরা সাধারণ মানুষরা মৃত্যুটাকে সহজে মেনে নিতে পারি না: নওশাবা

বিনোদন জগতের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ। তিনি অনবদ্য অভিনয়দক্ষতা দিয়ে দর্শকদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তার অভিনীত স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’। একটি গণমাধ্যমে সিনেমা প্রসঙ্গ ছাড়াও নানা বিষয়ে কথা বলেছেন অভিনেত্রী।

‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ সিনেমার ট্রেলার দেখেই আঁচ করা যায়, একটু ভিন্ন আঙ্গিকের কাজ?- এমন প্রশ্নের উত্তরে কাজী নওশাবা আহমেদ বলেন, নির্মাতা ফুয়াদুজ্জামান ফুয়াদ এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে করোনা মহামারির সময় থেকেই সিনেমাটি নিয়ে আমাদের কথা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে কাজটা ভীষণ যত্ন নিয়ে করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা সাধারণ মানুষরা ভেবে নিই, অনেক বছর বেঁচে থাকব। আর সে কারণে প্রকৃতিকে অবলীলায় ধ্বংস করে ফেলছি। কিন্তু মানুষের এই জীবন যে চিরস্থায়ী নয় এবং যতদিন আমরা বেঁচে থাকি ততদিন নিজেদের ভালোবাসতেও ভুলে যাই।

অভিনেত্রী বলেন, এমনকি পাশের মানুষটার সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি হয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে অমূল্য সম্পর্ক, সেটাকেও আমরা মূল্যায়ন করি না। এই মূল্যায়নের জায়গা থেকে একজন মানুষ ও শিল্পী হিসেবে আমার জীবনের যে অন্তর্নিবিষ্ট যাত্রা, তাতে এ সিনেমা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে জানান নওশাবা আহমেদ।

তিনি বলেন, খুব কাকতালীয় বা অলৌকিকভাবেই আমার জীবনের ও প্রকৃতিকে দেখার যে উপলব্ধি, ঠিক সেই সময় এ সিনেমার গল্পটা আসে। কিছু প্রিয় কবিতা মানুষ যেমন বারবার পড়ে এবং প্রতিবার নতুন করে আবিষ্কার করে, এই সিনেমাটিও আমার জীবনে বারবার যাপন করতে ইচ্ছা করে। আবার যখন জীবনে নতুন কোনো উপলব্ধি আসবে, তখন এ চরিত্রটা আবার নতুন করে করতে ইচ্ছা করবে।

আপনার সহশিল্পী ইমতিয়াজ বর্ষণের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নওশাবা বলেন, বর্ষণ আমার খুবই পছন্দের একজন মানুষ ও ভালো শিল্পী। আমার প্রথম সিনেমা ‘আলগা নোঙর’ থেকেই সে সহশিল্পী ছিল। যদিও সেই সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। তবে সে মানুষ হিসাবে খুব ভালো। এমনকি শিল্পী হিসেবেও ভীষণ সহযোগিতাপূর্ণ।

তিনি বলেন, এ সিনেমাটি খুব অল্প সময়ে আমরা শুটিং করেছি। কিন্তু আমাদের জার্নি ও প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘদিনের। এ রকম অসাধারণ টিম না পেলে এত কম সময়ে এমন কাজ করা সম্ভব হতো না।

অভিনেত্রী বলেন, মানুষ মরণশীল, কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে আমরা ভুলে যাই। আমাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা থাকে- আমরা অনেক দিন বাঁচব; তাই মৃত্যুটাকে সহজে মেনে নিতে পারি না। কিন্তু জন্মেছি যখন, মৃত্যু অবধারিত- এটাই চিরন্তন সত্য।

এ সিনেমাটিতে একটি সংলাপ শোনা যায়- ‘অমর হবার কোনো জাদুকরী পথ নেই’। সেই সংলাপ নিয়ে আপনার ভাবনা কী? উত্তরে নওশাবা বলেন, আমরা কেন যেন এক ধাঁধার মধ্যে পুরো জীবন পার করে দিই। মনে করি আজ ঝগড়া করলাম, কাল ভালোবাসব বা আজ গাছ কেটে ফেলে দু-বছর পর আবার লাগাব। কিন্তু আমি যে কাল পর্যন্ত বেঁচে থাকব, সেই সুযোগটা পাব কিনা তার নিশ্চয়তা কই? তাই অমর হতে হলে আসলে ভালোবাসা, অনুভূতি এবং প্রকৃতিকে রক্ষার মাধ্যমেই অমর হতে হয়- শারীরিক অবস্থান দিয়ে নয়।

‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ সিনেমার গল্পটা গভীর মনস্তাত্ত্বিক মনে হচ্ছে। আপনার দৃষ্টিতে কেমন?- এমন প্রশ্নের উত্তরে নওশাবা বলেন, এ সিনেমাটি মূলত একটি মানুষের জন্ম, মৃত্যু, প্রেম এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতির কথা বলে। এখানে কোনো বিষয় সরাসরি বলে দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, একটি ভালো কবিতা যেমন চারজন মানুষ পড়লে চার রকম অনুভূতি তৈরি হয়, এ সিনেমাটিও দর্শক তার নিজের মতো করে অনুধাবন করতে পারবেন। সিনেমাটি খুব বড় দৈর্ঘ্যের নয়, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা অনেক। এটি এমন এক কাজ, যা একজন শিল্পীকে বারবার নতুন করে করার তাগিদ দেয় বলে জানান এ অভিনেত্রী।

শুটিংয়ের গল্প শুনতে চাইলে নওশাবা বলেন, এত গুছিয়ে আর যত্ন নিয়ে কাজটা বানানো হয়েছে, আমরা কাজ শুরু করার আগেই জানতাম কী করতে যাচ্ছি এবং কতটুকু করতে যাচ্ছি। শুটিংয়ের সময় প্রচুর ঠাণ্ডা ছিল। কিছু দৃশ্য দেখলে দর্শক বুঝতেই পারবেন, সেখানে আমরা কোনো কৃত্রিম কুয়াশা ব্যবহার করিনি। রাত কিংবা কনকনে শীতের ভোর সাড়ে ৪টায় ঘন কুয়াশার মধ্যেই আমরা শুটিং করতে যেতাম। দৃশ্যগুলো দেখলে হয়তো কারও মনে হতে পারে, এআই দিয়ে করা কিংবা ফগ মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সত্যি বলতে- আমরা ওই তীব্র শীতের বাস্তব পরিবেশেই কাজ করেছি। এটি একটি অন্যরকম গভীর অনুভূতির কথা বলে, যা দর্শক দেখলেই বুঝতে পারবেন।