পার্টসের আড়ালে বিলাসবহুল গাড়ি

গাড়ির পার্টস আমদানির নামে দেশে ঢুকছে বিলাসবহুল গাড়ি। ভুয়া ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির নতুন কৌশলে চোরাচালানের এ চক্র দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিভিন্ন বন্দরে অতীতেও এমন চালান ধরা পড়লেও সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও কাস্টমস গোয়েন্দাদের নজরদারি জোরদারের পর একের পর এক চালান শনাক্ত হচ্ছে। মোংলা বন্দরে পার্টসের আড়ালে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির অংশ জব্দের পর একই কায়দায় চট্টগ্রামে আরও একটি বিএমডব্লিউ এবং কক্সবাজারে তিনটি স্পোর্টস কারের সন্ধান মিলেছে।

গত ২৭ আগস্ট চট্টগ্রামে যন্ত্রাংশ হিসেবে আমদানি করে স্থানীয়ভাবে জোড়া লাগানো একটি বিএমডব্লিউ আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গাড়িটি পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় আমদানি না করে দুবাই থেকে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ হিসেবে আনা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাসের পর কাপ্তাই-চন্দ্রঘোনা এলাকার একটি স্থানে এসব অংশ জোড়া লাগানো হয়। পরে নগরীর মুরাদপুরের একটি অটোমোবাইল গ্যারেজে নিয়ে গাড়িটির বাকি কাজ সম্পন্ন করা হয়।

একই দিনে মোংলা বন্দরে একটি চালান পরীক্ষা করে চারটি বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া যায়। কাস্টমস গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, চালানটিতে রেঞ্জ রোভার ভোগ, বিএমডব্লিউ ৬৫০আই, লেক্সাস এলএক্স৫৭০ ও টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের অংশ ছিল। বাংলাদেশে এসব গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি। অথচ পুরো চালানটি ১৪ ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছিল মাত্র ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

এর আগে গত শুক্রবার কক্সবাজারের কলাতলীতে অভিযান চালিয়ে তিনটি নামিদামি স্পোর্টস কার জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। গাড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে টয়োটা সুপ্রা, হোন্ডা সিভিক ও মাজদা এমএক্স-ফাইভ। গোয়েন্দারা জানান, ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানি করে পরে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি তৈরির কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। কক্সবাজারে জব্দ করা গাড়িগুলোও একই প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের হিসাবে, একটি বিলাসবহুল গাড়ি পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় আমদানি করে খালাস করলে সরকারকে কোটি কোটি টাকা শুল্ক-কর দিতে হয়। কিন্তু একই গাড়ির বিভিন্ন অংশ পার্টস হিসেবে আমদানি করলে শুল্কের পরিমাণ অনেক কমে যায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিপুল রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এমনভাবে শত কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, অতীতেও পার্টসের নামে গাড়ির বিভিন্ন অংশ এনে দেশে জোড়া লাগানোর ঘটনা ধরা পড়েছে। তবে এবার এনবিআর ও কাস্টমস গোয়েন্দাদের কঠোর নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও আইটি ট্র্যাকিংয়ের কারণে গোপন চালানগুলো দ্রুত শনাক্ত হচ্ছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশের প্রয়োজনেই এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর। সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

এদিকে ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টসের’ আড়ালে ১২ কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি ধরা পড়েছে। জাপান থেকে আমদানি করা একটি কনটেইনার খুলতেই বেরিয়ে আসে বিলাসবহুল তিন গাড়ির বিভিন্ন অংশ। এর মধ্যে রয়েছে লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫। একই কনটেইনারে পাওয়া গেছে টায়ারসহ গাড়ির বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ। প্রাথমিকভাবে এসব গাড়ি ও যন্ত্রাংশের বাজারমূল্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করছেন কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্মপরিচালক সাগর সেন বলেন, ‘চালানটি বন্দরে আসার পর বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়নি। ফলে নিলামে চলে যায়। চারটি গাড়ির শুল্ককরসহ দাম প্রায় ১২ কোটি টাকা। গাড়িভেদে ১০৩ থেকে ৬২১ শতাংশ শুল্কযোগ্য। ৪০ ফুট লম্বা একটি কনটেইনারে তিন লেয়ারে গাড়িগুলো আনা হয়। কনটেইনারের সামনের দিকে পার্টস দিয়ে সাজানো ছিল।’